যুদ্ধদিনের গল্প

আখতার জামানের ‘যুদ্ধদিনের গল্প’ হয়ে উঠেছে সমগ্র বাংলার যুদ্ধকালীন বাস্তবতা।

আখতার জামানের ‘যুদ্ধদিনের গল্প’ হয়ে উঠেছে সমগ্র বাংলার যুদ্ধকালীন বাস্তবতা।

সালেক শিবলু

মুক্তিযুদ্ধ বাঙালি জাতির আত্ম-অহঙ্কার। এই ইতিহাসের সাথে জড়িয়ে আছে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসরদের নিমর্ম ও নৃশংস অত্যাচারের কাহিনী। মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের সৃজনশীল সাহিত্য বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। মুক্তিযুদ্ধের গণজাগরণ ও বৈপ্লবিক চেতনা আমাদের সাহিত্যকে আলোকিত করেছে। মুক্তিযুদ্ধকে নিয়ে গড়ে উঠেছে স্বতন্ত্র ধারার মুক্তিযুদ্ধের সাহিত্য। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে রচিত হয়েছে উল্লেখযোগ্য ছোটগল্প। সব ছোটগল্প শিল্পোত্তীর্ণ না হলেও কোনো কোনো ছোটগল্প অনুপম শিল্পকর্মে পরিণত হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ছোটগল্পগুলোতে যুদ্ধের নয় মাসের বহুমাত্রিক চিত্র পাওয়া যায়। একাত্তরের মার্চের পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নিমর্ম অত্যাচার, নৃশংস গণহত্যা, ধষর্ণ, ব্যাপক ধ্বংসলীলা, হাজার হাজার মানুষের দেশত্যাগ, দেশের মানুষের নিরাপত্তাহীনতা, নানা মানবীয় সংকট ইত্যাদি অনুসঙ্গ ছোটগল্পের উপাদান হয়ে এসেছে। এসব ঘটনা মুক্তিযুদ্ধের গল্পগুলোতে নানাভাবে প্রতিফলিত হয়েছে বিচিত্র আঙ্গিকে। তৎকালীন, সমাজ ও রাজনৈতিক সমাজ বাস্তবতার দৃশ্যচিত্র অঙ্কনে অনেকেই এ সময় বাংলা ছোটগল্পে সরব ভূমিকা পালন করেন তাঁদের মধ্যে আখতার জামান অন্যতম। তিনি যুদ্ধদিনের গল্প (২০২০) গ্রন্থে গল্পের প্লট নির্মাণে তিনি তাঁর দেখবার ও দেখাবার স্বতন্ত্র শিল্পদৃষ্টির পরিচয় দিয়েছেন।

গ্রন্থটি আমি এই সেদিন পড়ে শেষ করলাম। পড়ে একটু ধক্কা খেলাম নিজে নিজেই। এই গল্পগুলো কেন আর একটু আগে পড়েনি! গল্প বলছি এই কারণে- গ্রন্থের প্রতিটি অধ্যায় এক একটি সার্থক বুনটে সৃষ্ট গল্প। আবার উপন্যাসও বলা যেতে পারো। কারণ সম্পূর্ণ গ্রন্থটি একটি প্লটে রচিত যা বর্ণনার রঙ তুলিতে একাধিক গল্প মিলে একটি যুদ্ধ দিনের গল্প হয়ে উঠেছে । সেই দৃষ্টিতে উপন্যাস বললেও ভুল হবে না।

না পড়ায় একটু হলেও আমার অপরাধ বোধ হলো। কিন্তু যারা অর্হনিশ বাংলাদেশের কথাসাহিত্য নিয়ে আস্ফালন করে বেড়ান তাদের কাছে আমার জিজ্ঞাসা কেউ কি আদৌ এই মহান গ্রন্থটি পাঠ করে আন্দোলিত হয়েছেন? গ্রন্থটি আমার পাঠজৎগত কে যে ভাবে আন্দোলিত করেছে অন্য পাঠককে কি সে ভাবে পেরেছে? আমার মনে হয় না এ পর্যন্ত গ্রন্থটি নিয়ে সিরিয়াস কোন সমালোচনা হয়েছে। অথচ এমন একটি গ্রন্থ যা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সাহিত্য সম্ভারে নিঃসন্দেহে শিল্পমানে সমৃদ্ধ করেছে। আমি যে ভাবে জোর দিয়ে প্রেরণাদীপ্ত স্টাইলে বলছি তাতে মনে হয় রীতিমত অশ্রব্য শোনাবে। কিন্তু আমি নাচার। এই গল্পগুলো যে ভাবে আমার গল্পভূবনে কম্পন সৃষ্টি করেছে। জীবনের স্তরে স্তরে, অভিজ্ঞতা পর্বে-পর্বে গ্রন্থের গল্পগুলি বিস্তৃত জায়গা নিয়ে আছে- যার প্রকৃত এবং মূল অনুষঙ্গ মুক্তিযুদ্ধ।

গল্পের পটভূমিতে লেপটে দিয়েছেন পাবনা জেলার যুদ্ধোত্তর সময়। তাঁর ‘যুদ্ধদিনের গল্প’ কেবল মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যক্ষ ঘটনার কিংবা ইতিহাসাশ্রিত বয়ান নয়, বরং তা মুক্তিযুদ্ধোত্তর সমাজ-রাজনীতির এক অসামন্য নান্দনিক উপস্থাপনা। যুদ্ধদিনের চেতনা ও দর্শন, সমাজ, রাজনীতি ও জনজীবনের সাথে অঙ্গীভূত করে । ‘যুদ্ধদিনের গল্প’ নির্মাণে তিনি তাঁর সাতন্ত্র্য সত্তার পরিচয় দিয়েছেন। গল্পকারের চিন্তা-মনস্তত্ত্ব, প্রত্যাশা-হতাশা সবকিছুই নিয়ন্ত্রিত হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন সাহস ও এর পরিণতির দ্বারা। মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে সমাজজীবনের যে সংকট ও অসঙ্গতি দেখা দিয়েছিল, কখনো কখনো সেসব সমস্যা ও সংকট গল্পে ঠাঁই পেয়েছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার অনুষঙ্গী হয়ে। গল্পকারকে লিখতে দেখি- ‘এই গল্প আমি আমার চারপাশের চেনাজানা মানুষ, পত্র-পত্রিকা কিংবা মানুষের জীবনে অসংখ্য গল্প থাকে। প্রত্যেকেই মনের গোপন পৃষ্ঠায় পরম মমতায় লিখে রাখেন নিজের গল্প।’

এ সব গল্পের প্লট নির্মাণে অধিকাংশ ঘটনা পাবনা জেলার বিভিন্ন অঞ্চল হলেও গল্প গুলো হয়ে উঠেছে সমগ্র বাংলাদেশের গল্প। দেশের রাজনীতিতে সাধারণ মানুষের ভাবনা, পাকিস্তানি বাহিনীর অত্যাচর, মুক্তিযুদ্ধাদের সাহস, সংগ্রাম ও আত্মত্যাগ, সংখ্যালগুদের অস্তিত্বের সংকট, রাজাকারদের নিপীড়ন ইত্যাদির সুনিপুণ চিত্র তুলে এনছেন একটি পুর্ণাঙ্গ ক্যানভাসে।
চাঁদ তারার পরিবর্ততে আনাচে-কানাচে লাল সবুজের পতাকা উত্তলন এবং শেখ মুজিবুর রহমানের গেফতারের পর দেশের প্রান্তিক শ্রেণির মানুষের ভেতর বাহিরে যে চাপা আতঙ্ক চলছিল তার বহিঃপ্রকাশ করেছেন তারাপদ মাস্টারের চরিত্রে। এই বয়ানের মধ্যদিয়ে গল্পের উত্থান শুরু হয়েছে। তারাপদ মাস্টার পেশায় একজন স্কুল শিক্ষক তাঁর চরিত্রে উঠে এসেছে একাত্তরের একজন সংখ্যালগু হিন্দু শিক্ষকের অস্তত্ব সংকট। ঢাকা বেতারের সংবাদ তারাপদের মন জুড়ায় না কারণ বেতার আগে থেকেই দখল করেছে রাষ্ট্রযন্ত্র। তাই আকাশবাণী অথবা বিবিসি দিকে তাকে চেয়ে থাকতে হয়, এতেও যদি কিছুটা সস্তি পাওয়া যায়! এই উৎকন্ঠা হয়ে উঠেছে সমগ্র বাংলার তারাপদদের উৎকণ্ঠা।

সিকান্দার আলীর চেতনায় ফুটে উঠেছে তৎকালীন রাজনৈতিক বাস্তবতা। ‘আজ ভোরে দিলাম সাতটা বিহারীকে জবাই। বাজারে নাইট গার্ড শালা বিহারীদের ধরে একটা করে… । তবে জবহ কারার মতো দোষ না। দোষ করেছে ওদের নেতা। কুত্তার বাচ্চা ইয়াহিয়া।’ ‘পাকিস্থানীরাই শুধু আমাগরে শত্রু না। আমাগরে শত্রু আমিরিকা রাশিয়া চীন। ওরা আমাগরে নিয়া রাজনীতি করতিছে। অস্ত্র তুলে দিতেছে মানুষ মারার জন্য।’ এটা ছিল বাংলাদেশ কে নিয়ে বিশ্বমড়লদের যুদ্ধযুদ্ধ খেলা।

দিনলিপির মতো ৭১’র প্রতিটি ঘটনা এসেছে গল্পে পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে। কখনো শেখ মুজিবের গেফতার, ওয়ালেস বার্তায় স্বাধীকারের ঘোষনা; আবার কখনো উঠে এসেছে পাবনার চতুরভূজ সংঘাতে টিপু বিশ্বাসের নকশাল বাহিনী বনাম মুক্তিযুদ্ধাদের ভয়াবহ সংঘর্ষ। বাদ পরেনি প্রাণভয়ে মানুষ দিকবিদকি ছোটাছুটির চিত্রও। বিশেষ করে সংখ্যালঘু হিন্দু পরিবারের বাস্তবতার যে চিত্র উঠে এসেছে গল্পে তা মূলত সমগ্র বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের। তারাপদ মাস্টার, গৌরী রায়, দুলি পাবনার সীমনা ছাড়িয়ে তারা হয়েছে উঠেছে সমগ্র বাংলা সংখ্যালঘু হিন্দুর প্রতীক।

‘দেশের অবস্থা যখন খারাপ থাকে তখন মানুষ ধর্ম কর্মের দিকে মনোযোগ দেয়।’ অনেকেই প্রাণনাশের ভয়ে ভয়ানক পরিমাণের নামাজ পড়া শুরু করে। কারণ- ‘যারা নামাজ কালামে ঠিকঠাক তারা পাকিস্তানের ভাঙন চাইবে না। সব মুসলমানের উচিৎ হবে দুইটা জিনিসে বিশ্বাস রাখা। এক, ইন্ডিয়া কোনদিনই পাকিস্তানের বন্ধু হবে না। দুই, আওয়ামী লীগ যারা করে তারা সাচ্চা মুসলমান না। এরা ইন্ডিয়ার দালাল, ছদ্মবেশী হিন্দু নাসারাত এবং তারা কেয়ামত পর্যন্ত মুসলমানের শত্রু।’ তসলিমের এই উক্তি প্রমাণ করে যখনই কেউ পাকিস্তানের বিপক্ষে গিয়েছে তখনই সে ইন্ডিয়ার দালাল, তখনই নাসারাত। মূলত ধর্মের নামে রাজনৈতিক ফায়দালুটা ছিল হাজারো তসলিমদের নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার। এরকম শত তসলিম আমাদের ঘরের খবর পরের কাছে তুলে দিয়েছে। ফলে সোনার বাংলা পরিনত হয়েছে জাহান্নামে।

যুদ্ধদিনের গল্প প্রামাণ্য চিত্রের মত উঠে এসেছে ১০ এপ্রিলের মুজিবনগর সরকার গঠনের আনুষ্ঠানিকতা, ১৭ এপ্রিলের স্বাধীন বাংলাদেশের আত্মপ্রকাশ শপত; প্রবাসী সরকারের কোলকাতার জীবনযাপন; খন্দকার মোস্তাকের মনঃক্ষুন্নতা। তাজউদ্দিন কন্যার সাথে মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর কথপোকথনে বিজলীবাতির মত জ্বলে উঠেছে বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রীর সততা, প্রজ্ঞা, রাজনৈতিক জীবনদর্শন।

যুদ্ধের ট্রেনিং ক্যাম্পে বিভিন্ন মতপার্থক্য ছিল। গল্পকার তাঁরতীক্ষè দৃষ্টি দিয়ে ঘটনার গভীরে প্রবেশ করে অভিজ্ঞ ডুবুরির হয়ে তুলে নিয়ে এসেছেন ট্রেনিং প্রতীক্ষার যোদ্ধাদের মনঃদ্বৈরথের ছবি। ‘ছাত্র ইউনিয়ন যারা করেছে তাদের প্রশিক্ষণে নেয়া হচ্ছে না। তারা চলে যাচ্ছে অন্য ক্যাম্পে। বিশেষ কিছু ক্যাম্প আছে যেখানে এতো কিছু করা হয় না। যুদ্ধের আঁচ ছড়িয়ে পরে দেশগ-ি পেরিয়ে কোলকাতার স্মরণার্থী শিবিরের স্বপ্নচারিণী অভুক্ত মানুষের ভেতরে । তাঁদের প্রতিক্ষা কবে উদিত হবে স্বাধীনতার লাল সুর্য। ‘হাজার হাজার খুপড়ির ভেতরে খেয়ে না খেয়ে লক্ষ লক্ষ মানুষ অপেক্ষায় আছে। স্বাধীনতার জন্য প্রতিক্ষা।’

মুক্তিযুদ্ধে অনেকেই পাকিস্তানীদের সাথে আতাত করলেও নিভৃতে কাজ করে গেছে দেশের জন্য তার বড় উদাহরণ ইউনুস আলী। ইউনুস আলী রাজাকার সেজেছে, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মিশে গিয়েছেন রাজাকার বনে। খবর সংগ্রহ করে পৌছে দিয়েছেন মুক্তিসেনাদের কাছে। পাকিস্তানীদের ভ্রান্ততথ্য দিয়ে করেছেন পাকরাও। সমগ্র বাংলার যুদ্ধদিনের গল্প খুঁজলে এরকম অনেক ইউনুস আলী পাওয়া যাবে, যারা নেতিবাচকতার আড়াল থেকেই আমৃত্যু কাজ করেছেন দেশের জন্য। অথচ অনেক সময় তাদের পড়তে হয়েছে দু পক্ষেরই রোশানলে।

যুদ্ধদিনের গল্পে উঠে এসেছে পাকিস্তানী বাহিনীর নারকীয় হত্যাযজ্ঞ জ্বালাও-পোড়াও। এ চিত্র ছিল তৎকালীন সমগ্র বাংলার চিত্র। তবে হত্যযজ্ঞকে পাশকাটিয়ে গল্পকার তুলে এনছেন পুত্র শোকে কাতর পিতার অন্তঃদহন। শতপুত্র হারানো পিতার প্রতিনিধি হয়ে উঠেছে আজিম সাহেব। নিজ পুত্রের সন্ধান না পেলেও নামের মিল থাকা মুক্তিযোদ্ধার গলিত লাশ দাফন করেই গগন বিদারী আর্তিতেই কিছুটা হলেও পুত্রশোক প্রশমিত করা চেস্টা করেছে- ‘হে আল্লাহ! আমি আমার পুত্রের জানাজা নামজ পড়ছি! আমি আমার পুত্রের জন্য দোয়া করছি। তুমি আমার পুত্রকে শহীদের মর্যদা দান করো।’ হানাদার বাহিনী গণহত্যার ঐতিহাসিক বয়ানের সত্যতা লঙ্ঘন করেননি গল্পকার, বরং সেটিকে মান্য করেছেন পুরো মাত্রায়। খ- খ- চিত্রে এভাবেই তিনি প্রমূর্ত করেন যুদ্ধকালীন বাস্তবতা।

স্বাধীনতা যুদ্ধকালের অদম্য ইচ্ছাশক্তি ও স্বপ্ন-সাধ-আশা-আকাক্সক্ষা যুদ্ধোত্তরকাল শেষ হতেই ক্রমে তা ভেজাল স্বপ্নে পরিণত হচ্ছে। যুদ্ধ শেষে হাজারো মানিক চাঁদকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। তবে অনেকইে যুদ্ধ না করেও বিজয়উল্লাসে মিশে একাকার হয়ে গেছে। অনেকে দেখে অবাক হওয়া ছাড়া আর কিছুই বলার ছিল না কারো। তাই গল্পকারকে লিখতে দেখি- ‘যেন জিতে যাওয়া যুদ্ধের পর আরেকটি অদৃশ্যমান অনাকাক্সিক্ষত যুদ্ধের ভেতরে মানুষ ঢুকে যাচ্ছে। এবং সেই সেই যুদ্ধের প্রস্তুতিতে এক অদৃশ্য শত্রু খোলস পাল্টে উল্লাস করছে। আর একদল মানুষ হারিয়ে যাচ্ছে।’

আখতার জামানের কথনশিল্পের মূলপ্রভাবক হয়ে উঠেছে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ। কেবল একাত্তরের ঘটনার আবেগী বিবরণ সর্বস্ব নয় তাঁর যুদ্ধদিনের গল্প। তাঁর শিল্পকল্পনার ভিত্তিভূমি মূলত বাস্তব এবং এর সঙ্গে অন্বিত হয়েছে ব্যক্তিক ও সামষ্টিক আশা-আকাক্সক্ষা এবং সমগ্র বাঙালি জাতিসত্তার প্রত্যাশার অভিদ্যোতনা। আর এ অভিদ্যোতনা শিল্পিত আবহকে রক্ষা করেই নির্মাণ করেছেন। মানুষের যাপিত জীবনের আস্ত অবয়ব উন্মোচনে তিনি আশ্রয় নেন মনোচারিতার, স্বপ্নকল্পনার, প্রতীকের। শেষ বিচারে এ কথা বলা যেতে পারে, তাঁর গল্পে ইতিহাস এসছে গল্পের প্রয়োজনে বলে মনে হয় না। অনেক সময় মনে হয়েছে আরোপিত যা গল্পকার একটু দৃষ্টিদিলে হয়তে আরো শিল্পম-িত করতে পারতেন ।

# এমফিল গবেষক, বাংলা বিভাগ, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর ।

আখতার জামানের ‘যুদ্ধদিনের গল্প’ হয়ে উঠেছে সমগ্র বাংলার যুদ্ধকালীন বাস্তবতা। Read More

ছফার পরিবার ।। মোহাম্মদ আব্দুর রউফ

ছফার পরিবার

মোহাম্মদ আব্দুর রউফ

এক
বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে কখনোসখনো আহমদ ছফার (১৯৪৩-২০০১) ছবি দেখে বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকতাম। এখনো থাকি। এই পূর্বাপর তাকানোর মধ্যে আসমান-জমিনের ন্যায় ফারাক। তখন জীবিত আহমদ ছফা আমার কাছে মোটেই গুরুত্ব পায়নি। এমনকি একটি বইও সংগ্রহ করিনি। মূলত একাডেমিক প্রয়োজন ছাড়া তখন কোনো বই-ই সংগ্রহ করতাম না। আমাদের ছাত্রজীবন সমাপ্ত হওয়ার পূর্বেই আহমদ ছফার জীবনের অবসান ঘটে যায়। প্রয়াণের দুদশক পেরিয়ে গেলেও এখনো আহমদ ছফার দিকে তাকিয়ে থাকি। সেই তাকানোতে বিস্ময়বোধ গভীর থেকে গভীরতর হচ্ছে। যেখানেই থাকি, আহমদ ছফার মেরুন রঙের রচনাবলি চোখের সামনে ভাসতে থাকে, ভাসতে থাকে ছফার সাদাকাল ঐ চিন্তাগ্রন্থ ছোট্ট ছবিটি। কী ভাবতেন আহমদ ছফা?
দুই
আহমদ ছফার জীবন ও সাহিত্যকর্মের দিকে তাকালে দেখা যায়, কেবল নিজেই ভাবতেন না তিনি, পরবর্তী প্রজন্মের জন্যও ভাবনার সুযোগ তৈরি করে দিয়েছেন। মাঝেমধ্যে আহমদ ছফাকে নিয়ে বিষম বিপদে পড়ে যাই। কখনোকখনো আহমদ ছফার কিছু কিছু মন্তব্য মেনে নিতে সত্যিই কষ্ট হয়। মনেপ্রাণে আহমদ ছফার পর্যবেক্ষণকে অসার প্রমাণ করতে উঠেপড়ে লাগি। যদি সত্যি সত্যি অসার প্রমাণিত হতো তাহলে দেশ ও জাতির জন্য নিঃসন্দেহে মঙ্গলজনক হতো। অন্তত দুএকটি পর্যক্ষেণ উল্লেখ করা দরকার। ‘নিহত নক্ষত্র’ গল্পে আহমদ ছফা লিখছেন-‘প্রবীণ সাহিত্যিকদের দেখলে আমার বর্ষীয়সী বারাঙ্গনার কথা মনে হয়।’ বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস (১৯৯৭) প্রবন্ধগ্রন্থে আহমদ ছফা লিখছেন-‘আমাদের কবি-সাহিত্যিকেরা আমাদের সমাজের সবচেয়ে নোংড়া মানুষ। তাঁরা দেশকে যে হারে ফাঁকি দিয়েছেন কোন কালোবাজারির সঙ্গে তার তুলনা হয় না। তাঁদের ছদ্ম আদর্শবাদিতার সঙ্গে গণিকাদের সতীপনার তুলনা করা যায়।’ আহমদ ছফার সমসাময়িক সময় ও সমাজ থেকে বর্তমান অবধি বুদ্ধিবৃত্তিক সমাজের দিকে একটুখানি নিবিড়ভাবে তাকালে দেখা যায়, আহমদ ছফার পর্যবেক্ষণে বিন্দু পরিমাণ সন্দেহ নেই। আহমদ ছফা সমকালে শীর্ষ সাহিত্যিক ছিলেন। নিজে সাহিত্যিক হওয়ায় সাহিত্য-সমাজের অন্তর্মহলের নোংরামি তিনি ধরতে পেরেছিলেন। মূলত সুবিধাবাদী সাহিত্যিকের সুবিধাবাদী স্বার্থপর আচরণ দেখে তিনি বিক্ষুদ্ধ হতেন। ছফার নানা লেখায় সেই বিক্ষুদ্ধ-মনের পরিচয় লক্ষ্য করা যায়।
তিন
আহমদ ছফা বাঙালি জাতিসত্তা জাগরণের প্রত্যক্ষ সাক্ষী। এই সাক্ষ্যের সাহিত্যিক বয়ান তার সাহিত্যকর্মের সর্বত্রই লক্ষ্য করা যায় বিশেষত অঙ্কুর (১৯৭৫) উপন্যাস এবং জাগ্রত বাংলাদেশ (১৯৭১) প্রবন্ধগ্রন্থে। আহমদ ছফা এই জাগরণ থেকেই স্বাধীন বাংলাদেশে কিছুটা হলেও পাশ্চাত্য রেনেসাঁ প্রত্যাশা করেছিলেন। সেই প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির মধ্যে বিপুল ব্যবধানে আহমদ ছফা ব্যথিত হয়েছিলেন। আহমদ ছফার অভিযোগ-শিক্ষক, শিল্পী-সাহিত্যিক, সাংবাদিক অর্থাৎ বুদ্ধিবৃত্তিক মহল তাঁদের দায়িত্ব পালন করেনি। আহমদ ছফার সুষ্পষ্ট বক্তব্য-‘বুদ্ধিজীবীরা যা বলতেন, শুনলে বাংলাদেশ স্বাধীন হত না। এখন যা বলছেন, শুনলে বাংলাদেশের সমাজ-কাঠামোর আমূল পরিবর্তন হবে না।’ আহমদ ছফা বাংলাদেশের সমাজ কাঠামো সাম্য, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা ইত্যাকার আদর্শে ঢেলে সাজাতে চেয়েছিলেন। এই সাজানোর জন্য দরকার ছিল ছোটখাট একটি বিপ্লবের। বিপ্লবের জন্য দরকার ছিল বিপ্লবী-নেতৃত্বের। আহমদ ছফা একজন মানুষ (নেতৃত্ব) প্রত্যাশা করেছিলেন, যে কাঁদাজল মাখা মানুষের সঙ্গে কাঁদাজল মেখে তাদের শক্তি ও সাহস দিয়ে এই জাতিকে জাগিয়ে তুলবে। কিন্তু তা হয়নি। হয়তোবা একারণেই আহমদ ছফা কিছুটা অভিমানে প্রবীণ বটের কাছে প্রার্থনা জানিয়েছিলেন।
চার
আহমদ ছফার ছোট্ট এই জীবনখানির দিকে একটু নিবিড়ভাবে তাকালে আমরা দেখব, নিজের স্বাস্থ্য ও সম্পদের দিকে তিনি একেবারেই নজর দেননি। বিয়েসাদি করেননি। স্ত্রী-পুত্র, পরিবার-পরিজন ছিল না। দেশের মানুষকেই তিনি পরিবার মনে করতেন। ব্যক্তিজীবনেও তিনি বিপদগ্রস্থ মানুষের পাশে সাধ্যমত দাঁড়াতেন। এমনকি জীবনের ঝুঁকি নিয়েও। আহমদ ছফার স্মারকগ্রন্থে নানাজন নানাভাবে আহমদ ছফার এই মানবিক মহানুভবতার কথা উল্লেখ করেছেন। তবে ব্যক্তিমানুষ আহমদ ছফার উদ্দেশ্য ছিল না। তিনি মূলত পুরো জাতির পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। বাঙালি জাতিকেই জাগিয়ে তুলতে চেয়েছিলেন। এজন্য সাহিত্যকে মাধ্যমরূপে ব্যবহার করেছিলেন। প্রমাণ স্বরূপ বাঙালি মুসলমানের মন (১৯৮১) প্রবন্ধগ্রন্থটি স্মরণ করা যেতে পারে। গ্রন্থটি সমকালে বিপুল আলোড়ন তুললেও অনেকেই সমালোচনার পথ বেছে নিয়েছিল। এমনকি আজও কোনো কোনো বটতলার পন্ডিতকে ঐ পথে হাঁটতে দেখা যায়। বাঙালি মুসলমানের মন (১৯৮১) প্রবন্ধগ্রন্থে আহমদ ছফা মূলত বাঙালি মুসলমানের মনস্তাত্ত্বিক সংকট ও সমস্যার কথা চিহ্নিত করেছেন। সেই সঙ্গে সংকট কাটিয়ে বাঙালি মুসলমানের মধ্যে বিজ্ঞানভিত্তিক জাগরণ প্রত্যাশা করেছেন।

পাঁচ
বাঙালি মুসলমানের জাগরণ প্রত্যাশা করলেও আহমদ ছফা অপরাপর কোনো জাতিগোষ্ঠীকে অবহেলা করেননি। বরং হিন্দু, বৌদ্ধ, মুসলিম, খ্রিষ্টান, জৈনসহ সমুদয় ধর্মমত পেরিয়ে সবাইকে তিনি মানুষ হিসেবে বিবেচনা করতেন। এমনকি কখনোকখনো পুরো পৃথিবীকেই একটি রাষ্ট্ররূপে বিবেচনা করতেন। সংখ্যালঘু-সংখ্যাগুরু সবার অধিকারকে তিনি সমভাবে বিচার-বিবেচনা করতেন। এটি কেবল সাহিত্যিক চেতনা নয়। বাস্তব জীবনেও আহমদ ছফা সেটি বাস্তবায়ন করে দেখিয়েছেন। সুশীল নামের (উপজাতি) ছেলেটিকে তিনি সন্তানের মতো করে মানুষ করেছিলেন। আহমদ ছফার এই সামগ্রিক মানবিক বোধ পুষ্পবৃক্ষ এবং বিহঙ্গ পুরাণ (১৯৯৬) উপন্যাসে গভীরভাবে লক্ষ্য করা যায়। কেবল সুশীল নয়, পৃথিবীর সমুদয় মানুষকে তিনি নিজের মধ্যে ধারণ করেছিলেন। ‘সকলে আমার মধ্যে আছে’-এই দার্শনিক ভাবনা কেবল উপন্যাসের পাতায় নয়, জীবন দিয়ে তিনি প্রমাণ করে গিয়েছেন।
ছয়
আহমদ ছফা দেশের মানুষ ও সমাজকে সুগভীরভাবে আপন করে নিয়েছিলেন। ভ্রাতুষ্পুত্র আনোয়ারকে ০১/১২/১৯৯১ খ্রিস্টাব্দে একটি চিঠিতে লিখতে দেখি-‘একটি জিনিষ তোমাদের ভুলে গেলে চলবে না, আমি যতটুকু আমার পরিবারের, তার চেয়েও বেশি সমাজের। আত্মীয়তার দাবিতে অধিক কিছু কামনা করা আমার কাছে উচিত হবে না।’ কেবল আত্মীয় কিংবা রক্তের সম্পর্ক নয়, মূলত পুরো বাঙালি জনগোষ্ঠীকেই তিনি নিজের পরিবার বিবেচনা করতেন। এই মহান মনীষী ৩০জুন পূর্বদেশে দেশে জন্মেছিলেন। জন্মদিনে এই মনীষীর প্রতি অশেষ শ্রদ্ধা।

লেখক: পিএইচ ডি গবেষক ।

ছফার পরিবার ।। মোহাম্মদ আব্দুর রউফ Read More

মীর মশাররফ হোসেন

মীর মশাররফ হোসেন

বাংলা সাহিত্যের প্রথম বাঙালি মুসলিম নাট্যকার এবং প্রথম মুসলিম উপন্যাস রচয়িতা মীর মশাররফ হোসেন আধুনিক বাঙালি মুসলমান সাহিত্যিকদের পথিকৃৎ । সামগ্রিকভাবে তিনি উনিশ শতকের অন্যতম শ্রেষ্ঠ লেখক । ১৮৬৯ খ্রিস্টাব্দে তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘রত্নাবতী’ প্রকাশিত হয়। বিষয়বস্তু ও আঙ্গিক বিচারে তাঁর সাহিত্যকর্ম বিপুল ও বৈচিত্র্যময়। উপন্যাস, নাটক, প্রহসন, কবিতা, আত্মজীবনী, জীবনচরিত, ধর্ম-সাহিত্য সব রকম বিষয়েই লিখেছেন তিনি । তবে ‘বিষাদ সিন্ধু’ তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত ও জনপ্রিয় উপন্যাস । প্রথম প্রকাশের শতবর্ষ পরে, এখনও এটি পাঠক সমাদৃত। তিনি ১৯ ডিসেম্বর, ১৯১১ সালে পরলোকগমন করেন।

উদাসীন পথিকের মনের কথা কার রচনা ? এটি কোন ধরনের সৃষ্টিকর্ম ?

উদাসীন পথিকের মনের কথা রচনা করেছেন মীর মশাররফ হোসেন । এটি লেখকের আত্মজীবনীমূলক ও প্রত্যক্ষ নির্ভর উপাখ্যান । ১৮৯০ সালে প্রকাশিত এই গ্রন্থে নীলকরদের অত্যাচারের ভয়াবহ চিত্র এবং পরিণতি তুলে ধরা হয়েছে । এতে আছে দুঃখী জীবনের প্রতি অকৃত্রিম সহানুভূতি । হিন্দু – মুসলমানের সঙ্গবদ্ধ সংগ্রামের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ । এ রচনায় লেখকের সৃষ্টিশীল শিল্পচেনার মহত্তর পরিচয় পাওয়া যায় ।

বিষাদসিন্ধু  গ্রন্থের জনপ্রিতার কারণ কী?

মীর মশাররফ হোসেন রচিত বিষাদসিন্ধু বাংলা সাহিত্যের একমাত্র গদ্য মহাকাব্য । এটি মূলত ইতিহাস আশ্রিত রচনা । মহানবী (সা.) এর দৌহিত্র ইমাম হোসেনের সঙ্গে দামেস্ক অধিপতি এজিদের যুদ্ধে ইমাম হোসেনের বেদনাদায়ক মৃত্যুই এই রচনার উপজীব্য। ইসলাম ধর্ম সংশ্লিষ্ট স্পর্শকাতর বিষয় হওয়ায় এটি মুসলমানদের কাছে জনপ্রিয় হয়েছে । এছাড়া চিত্তাকর্ষক রচনাগুণ গ্রন্থটি জনপ্রিয় হওয়ার অন্যতম কারণ ।

মীর মশাররফ হোসেন রচিত তিনটি নাটক ও তিনটি পরিচয় ।

মীর মশাররফ হোসেন বাংলা গদ্যসাহিত্যে মুসলিম লেখক হিসেবে সবিশেষ গুরুত্বের অধিকারী। সাহিত্যের অপরাপর ক্ষেত্রে তাঁর কৃতিত্বের সঙ্গে বাংলা নাটক রচনায়ও তাঁর প্রতিভা সমধিক বিকশিত হয়েছে । মীর মশাররফ হোসেন রচিত নাটক ও প্রহসনগুলো তৎকালীন সমাজ ও সংস্কৃতির অনন্য দলিল । নিম্নে তাঁর তিনটি নাটক ও তিনটি প্রহসনের নাম দেওয়া হলো :
নাটক : ১. বসন্তকুমারী, ২. জমিদার দর্পণ ও ৩. বেহুলা গীতাভিনয় ।
প্রহসন : ১. এর উপায় কি , ২. ভাই ভাই এইতো চাই ও ৩. ফাঁস কাগজ ।

মীর মশাররফ হোসেন রচিত তিনটি কাব্য ও তিনটি উপন্যাসের পরিচয় দাও ।

মীর মশাররফ হোসেন বাংলা সাহিত্যের আধুনিক যুগে প্রথম উল্লেখযোগ্য মুসলিম সাহিত্যিক । তাঁর বহুমুখী প্রতিভার বলে মুসলিম রচিত বাংলা সাহিত্য বিশেষভাবে সমৃদ্ধ হয়েছে । তিনি উপন্যাস, প্রহসন, কাব্য ও প্রবন্ধ প্রভৃতি সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় কৃতিত্ব দেখিয়েছেন । নিম্নে তাঁর তিনটি উপন্যাস ও তিনটি কাব্যের নাম দেওয়া হলো : উপন্যাস : ১. রত্নাবতী , ২. বিষাদসিন্ধু ও ৩. উদাসীন পথিকের মনের কথা । কাব্য : ১. গোরাই ব্রীজ , ২. প্রেম পারিজাত ও ৩. মৌলুদ শরীফ ।

বিষাদ সিন্ধু  উপন্যাসের নামের তাৎপর্য  সংক্ষেপে আলোচনা ।

বিষাদ সিন্ধু মীর মশাররফ হোসেনের অমর সৃষ্টি। কারবালার ঐতিহাসিক কাহিনী অবলম্বনে রচিত এ উপন্যাসের বিষয়বস্তু মর্মান্তিক ও বিষাদময় । ঔপন্যাসিক কারবালার এ বিষাদময় করুণ কাহিনীকে আরও বিষাদময় করে ফুটিয়ে তুলেছেন । উপাখ্যানের মূল বিষয় হিসেবে ইতিহাসের পাশাপাশি সুগভীর জীবনবোধ চিত্রিত হয়েছে । নিয়তির নির্মমভায় মানবভাগ্যের উপর নেমে এসেছে করুণ পরিণতি । এ করুণ পরিণতি পাঠকের চিত্তকে আবেগে আপ্লুত করে । পাঠক কাহিনীর যত গভীরে যায় ততই মন বিষাদময়তায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে । ঔপন্যাসিক ভয়াবহ এ পরিণতির রূপকে সিন্ধুর সাথে তুলনা করে এ নামকরণ করেছেন ।
এজিদ কে ?
মীর মশাররফ হোসেনের উপন্যাস তথা বাংলা সাহিত্যের একমাত্র গদ্য মহাকাব্য বিষাদ সিন্ধুতে এজিদের পরিচয় পাওয়া যায় । এজিদ ছিল দামেস্ক অধিপতি মুয়াবিয়ার একমাত্র পুত্র । হযরত মুহাম্মদ ( সাঃ ) -এর দৌহিত্র ইমাম হোসেনের সাথে কারবালা প্রান্তরে এজিদের সেনাদের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ হয় ।

আত্মজৈবনিক উপন্যাস কাকে বলে ? একটি আত্মজৈবনিক উপন্যাসের বিষয়বস্তু লিখুন ।

রচয়িতার নিজের কাহিনী যখন উপন্যাসের চরিত্রের মধ্য দিয়ে প্রকাশিত হয় এবং কাহিনী এগিয়ে চলে তাকে আত্মজৈবনিক উপন্যাস বলে । মীর মশাররফ হোসেনের ‘উদাসীন পথিকের মনের কথা’ বাংলা সাহিত্যের বিখ্যাত আত্মজৈবনিক উপন্যাস । ‘উদাসীন পথিকের মনের কথা’ ( ১৮৯০ ) গ্রন্থে নীলকর অত্যাচারের কাহিনী রূপায়ণের সঙ্গে উপন্যাসের বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান । আত্মজীবনীমূলক এ গ্রন্থে সে আমলের নীলকরদের ভয়াবহ অত্যাচারের চিত্র এবং তার পরিণতি প্রতিফলিত হয়েছে । গ্রন্থে মীর মশাররফ হোসেন ‘উদাসীন পথিক’ ছদ্মনাম অবলম্বন করেছিলেন । সামাজিক শ্রেণি সংঘাতের চিত্র এখানে স্পষ্ট । নীলকরদের অত্যাচারের চিত্র বর্ণনায় লেখকের যথেষ্ট সার্থকতা ফুটে উঠলেও গল্পরস মাধুর্যমণ্ডিত হয়নি ।

বসন্তকুমারী’ নাটকের বিষয়বস্তু কী ?

মীর মশারফ হোসেনের নাটকগুলোর মধ্যে ‘বসন্তকুমারী নাটক’ (১৮৭৩) বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য । মুসলমান নাট্যকার রচিত প্রথম হিসেবে এর গুরুত্ব বিদ্যমান । ইন্দ্রপুরে বিপত্নীক রাজার বৃদ্ধ বয়সে যুবতী-স্ত্রী গ্রহণ, রাজার যুবক পুত্রের প্রতি বিমাতার আকর্ষণ এবং প্রেমনিবেদন, পুত্রের প্রত্যাখ্যান এবং বিমাতার ষড়যন্ত্র, পরিশেষে রাজপরিবারের সকলের মৃত্যু-এ কাহিনী অবলম্বনে ‘বসন্তকুমারী নাটক’ রচিত ।

গাজী মিয়ার বস্তানী ‘ গ্রন্থের পরিচয় দিন ।

গাজী মিয়ার বস্তানী’ মীর মশাররফ হোসেনের আত্মজীবনীমূলক রসরচনা জাতীয় গ্রন্থ। গাজী মিয়া লেখকের ছদ্মনাম। চব্বিশ নথি বা পরিচ্ছেদ সম্বলিত দুই খণ্ডে সমাপ্ত এই গ্রন্থে গাজী মিয়ার আত্মপরিচয়, বস্তানীপ্রাপ্তির বিবরণ, অপর হস্তে অর্পনের কারণ, ফলশ্রুতি, পরিমাণ এবং সবশেষে গাজী মিঞার বিদায় – প্রভৃতি বিবরণের পরিপ্রেক্ষিতে তৎকালীন কলুষিত সমাজের চিত্র অঙ্কিত হয়েছে । এই গ্রন্থটিকে পরিবেশের প্রতি বীতশ্রদ্ধ ও রুগ্ন মীরমানসের এক প্রতিশোধাত্মক ‘দপ্তর’ বলে অভিহিত করা যায় ।

গদ্য মহাকাব্য কাকে বলে ? একটি গদ্য মহাকব্যের পরিচয় দিন ।

যে উপন্যাসধর্মী রচনা গদ্যে বিকাশ লাভ করে অথচ তার বাক্যগুলোতে এক ধরণের কাব্যিক ছন্দ পরিলক্ষিত হয় – এ ধরনের উপন্যাস কে গদ্য মহাকাব্য বলে । বাংলা সাহিত্যের একমাত্র গদ্য মহাকাব্য মীর মশাররফ হোসেনের ‘বিষাদ সিন্ধু’ । বিষাদসিন্ধু মূলত ইতিহাস আশ্রিত রচনা । মহানবী (সা.) এর দৌহিত্র ইমাম হোসেনের সঙ্গে দামেস্ক অধিপতি এজিদের যুদ্ধে ইমাম হোসেনের বেদনাদায়ক মৃত্যুই এই রচনার উপজীব্য । ইসলাম ধর্ম সংশ্লিষ্ট স্পর্শকাতর বিষয় হওয়ায় এটি মুসলমানদের কাছে জনপ্রিয় হয়েছে।
মীর মশাররফ হোসেন Read More