ছফার পরিবার ।। মোহাম্মদ আব্দুর রউফ

ছফার পরিবার

মোহাম্মদ আব্দুর রউফ

এক
বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে কখনোসখনো আহমদ ছফার (১৯৪৩-২০০১) ছবি দেখে বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকতাম। এখনো থাকি। এই পূর্বাপর তাকানোর মধ্যে আসমান-জমিনের ন্যায় ফারাক। তখন জীবিত আহমদ ছফা আমার কাছে মোটেই গুরুত্ব পায়নি। এমনকি একটি বইও সংগ্রহ করিনি। মূলত একাডেমিক প্রয়োজন ছাড়া তখন কোনো বই-ই সংগ্রহ করতাম না। আমাদের ছাত্রজীবন সমাপ্ত হওয়ার পূর্বেই আহমদ ছফার জীবনের অবসান ঘটে যায়। প্রয়াণের দুদশক পেরিয়ে গেলেও এখনো আহমদ ছফার দিকে তাকিয়ে থাকি। সেই তাকানোতে বিস্ময়বোধ গভীর থেকে গভীরতর হচ্ছে। যেখানেই থাকি, আহমদ ছফার মেরুন রঙের রচনাবলি চোখের সামনে ভাসতে থাকে, ভাসতে থাকে ছফার সাদাকাল ঐ চিন্তাগ্রন্থ ছোট্ট ছবিটি। কী ভাবতেন আহমদ ছফা?
দুই
আহমদ ছফার জীবন ও সাহিত্যকর্মের দিকে তাকালে দেখা যায়, কেবল নিজেই ভাবতেন না তিনি, পরবর্তী প্রজন্মের জন্যও ভাবনার সুযোগ তৈরি করে দিয়েছেন। মাঝেমধ্যে আহমদ ছফাকে নিয়ে বিষম বিপদে পড়ে যাই। কখনোকখনো আহমদ ছফার কিছু কিছু মন্তব্য মেনে নিতে সত্যিই কষ্ট হয়। মনেপ্রাণে আহমদ ছফার পর্যবেক্ষণকে অসার প্রমাণ করতে উঠেপড়ে লাগি। যদি সত্যি সত্যি অসার প্রমাণিত হতো তাহলে দেশ ও জাতির জন্য নিঃসন্দেহে মঙ্গলজনক হতো। অন্তত দুএকটি পর্যক্ষেণ উল্লেখ করা দরকার। ‘নিহত নক্ষত্র’ গল্পে আহমদ ছফা লিখছেন-‘প্রবীণ সাহিত্যিকদের দেখলে আমার বর্ষীয়সী বারাঙ্গনার কথা মনে হয়।’ বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস (১৯৯৭) প্রবন্ধগ্রন্থে আহমদ ছফা লিখছেন-‘আমাদের কবি-সাহিত্যিকেরা আমাদের সমাজের সবচেয়ে নোংড়া মানুষ। তাঁরা দেশকে যে হারে ফাঁকি দিয়েছেন কোন কালোবাজারির সঙ্গে তার তুলনা হয় না। তাঁদের ছদ্ম আদর্শবাদিতার সঙ্গে গণিকাদের সতীপনার তুলনা করা যায়।’ আহমদ ছফার সমসাময়িক সময় ও সমাজ থেকে বর্তমান অবধি বুদ্ধিবৃত্তিক সমাজের দিকে একটুখানি নিবিড়ভাবে তাকালে দেখা যায়, আহমদ ছফার পর্যবেক্ষণে বিন্দু পরিমাণ সন্দেহ নেই। আহমদ ছফা সমকালে শীর্ষ সাহিত্যিক ছিলেন। নিজে সাহিত্যিক হওয়ায় সাহিত্য-সমাজের অন্তর্মহলের নোংরামি তিনি ধরতে পেরেছিলেন। মূলত সুবিধাবাদী সাহিত্যিকের সুবিধাবাদী স্বার্থপর আচরণ দেখে তিনি বিক্ষুদ্ধ হতেন। ছফার নানা লেখায় সেই বিক্ষুদ্ধ-মনের পরিচয় লক্ষ্য করা যায়।
তিন
আহমদ ছফা বাঙালি জাতিসত্তা জাগরণের প্রত্যক্ষ সাক্ষী। এই সাক্ষ্যের সাহিত্যিক বয়ান তার সাহিত্যকর্মের সর্বত্রই লক্ষ্য করা যায় বিশেষত অঙ্কুর (১৯৭৫) উপন্যাস এবং জাগ্রত বাংলাদেশ (১৯৭১) প্রবন্ধগ্রন্থে। আহমদ ছফা এই জাগরণ থেকেই স্বাধীন বাংলাদেশে কিছুটা হলেও পাশ্চাত্য রেনেসাঁ প্রত্যাশা করেছিলেন। সেই প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির মধ্যে বিপুল ব্যবধানে আহমদ ছফা ব্যথিত হয়েছিলেন। আহমদ ছফার অভিযোগ-শিক্ষক, শিল্পী-সাহিত্যিক, সাংবাদিক অর্থাৎ বুদ্ধিবৃত্তিক মহল তাঁদের দায়িত্ব পালন করেনি। আহমদ ছফার সুষ্পষ্ট বক্তব্য-‘বুদ্ধিজীবীরা যা বলতেন, শুনলে বাংলাদেশ স্বাধীন হত না। এখন যা বলছেন, শুনলে বাংলাদেশের সমাজ-কাঠামোর আমূল পরিবর্তন হবে না।’ আহমদ ছফা বাংলাদেশের সমাজ কাঠামো সাম্য, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা ইত্যাকার আদর্শে ঢেলে সাজাতে চেয়েছিলেন। এই সাজানোর জন্য দরকার ছিল ছোটখাট একটি বিপ্লবের। বিপ্লবের জন্য দরকার ছিল বিপ্লবী-নেতৃত্বের। আহমদ ছফা একজন মানুষ (নেতৃত্ব) প্রত্যাশা করেছিলেন, যে কাঁদাজল মাখা মানুষের সঙ্গে কাঁদাজল মেখে তাদের শক্তি ও সাহস দিয়ে এই জাতিকে জাগিয়ে তুলবে। কিন্তু তা হয়নি। হয়তোবা একারণেই আহমদ ছফা কিছুটা অভিমানে প্রবীণ বটের কাছে প্রার্থনা জানিয়েছিলেন।
চার
আহমদ ছফার ছোট্ট এই জীবনখানির দিকে একটু নিবিড়ভাবে তাকালে আমরা দেখব, নিজের স্বাস্থ্য ও সম্পদের দিকে তিনি একেবারেই নজর দেননি। বিয়েসাদি করেননি। স্ত্রী-পুত্র, পরিবার-পরিজন ছিল না। দেশের মানুষকেই তিনি পরিবার মনে করতেন। ব্যক্তিজীবনেও তিনি বিপদগ্রস্থ মানুষের পাশে সাধ্যমত দাঁড়াতেন। এমনকি জীবনের ঝুঁকি নিয়েও। আহমদ ছফার স্মারকগ্রন্থে নানাজন নানাভাবে আহমদ ছফার এই মানবিক মহানুভবতার কথা উল্লেখ করেছেন। তবে ব্যক্তিমানুষ আহমদ ছফার উদ্দেশ্য ছিল না। তিনি মূলত পুরো জাতির পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। বাঙালি জাতিকেই জাগিয়ে তুলতে চেয়েছিলেন। এজন্য সাহিত্যকে মাধ্যমরূপে ব্যবহার করেছিলেন। প্রমাণ স্বরূপ বাঙালি মুসলমানের মন (১৯৮১) প্রবন্ধগ্রন্থটি স্মরণ করা যেতে পারে। গ্রন্থটি সমকালে বিপুল আলোড়ন তুললেও অনেকেই সমালোচনার পথ বেছে নিয়েছিল। এমনকি আজও কোনো কোনো বটতলার পন্ডিতকে ঐ পথে হাঁটতে দেখা যায়। বাঙালি মুসলমানের মন (১৯৮১) প্রবন্ধগ্রন্থে আহমদ ছফা মূলত বাঙালি মুসলমানের মনস্তাত্ত্বিক সংকট ও সমস্যার কথা চিহ্নিত করেছেন। সেই সঙ্গে সংকট কাটিয়ে বাঙালি মুসলমানের মধ্যে বিজ্ঞানভিত্তিক জাগরণ প্রত্যাশা করেছেন।

পাঁচ
বাঙালি মুসলমানের জাগরণ প্রত্যাশা করলেও আহমদ ছফা অপরাপর কোনো জাতিগোষ্ঠীকে অবহেলা করেননি। বরং হিন্দু, বৌদ্ধ, মুসলিম, খ্রিষ্টান, জৈনসহ সমুদয় ধর্মমত পেরিয়ে সবাইকে তিনি মানুষ হিসেবে বিবেচনা করতেন। এমনকি কখনোকখনো পুরো পৃথিবীকেই একটি রাষ্ট্ররূপে বিবেচনা করতেন। সংখ্যালঘু-সংখ্যাগুরু সবার অধিকারকে তিনি সমভাবে বিচার-বিবেচনা করতেন। এটি কেবল সাহিত্যিক চেতনা নয়। বাস্তব জীবনেও আহমদ ছফা সেটি বাস্তবায়ন করে দেখিয়েছেন। সুশীল নামের (উপজাতি) ছেলেটিকে তিনি সন্তানের মতো করে মানুষ করেছিলেন। আহমদ ছফার এই সামগ্রিক মানবিক বোধ পুষ্পবৃক্ষ এবং বিহঙ্গ পুরাণ (১৯৯৬) উপন্যাসে গভীরভাবে লক্ষ্য করা যায়। কেবল সুশীল নয়, পৃথিবীর সমুদয় মানুষকে তিনি নিজের মধ্যে ধারণ করেছিলেন। ‘সকলে আমার মধ্যে আছে’-এই দার্শনিক ভাবনা কেবল উপন্যাসের পাতায় নয়, জীবন দিয়ে তিনি প্রমাণ করে গিয়েছেন।
ছয়
আহমদ ছফা দেশের মানুষ ও সমাজকে সুগভীরভাবে আপন করে নিয়েছিলেন। ভ্রাতুষ্পুত্র আনোয়ারকে ০১/১২/১৯৯১ খ্রিস্টাব্দে একটি চিঠিতে লিখতে দেখি-‘একটি জিনিষ তোমাদের ভুলে গেলে চলবে না, আমি যতটুকু আমার পরিবারের, তার চেয়েও বেশি সমাজের। আত্মীয়তার দাবিতে অধিক কিছু কামনা করা আমার কাছে উচিত হবে না।’ কেবল আত্মীয় কিংবা রক্তের সম্পর্ক নয়, মূলত পুরো বাঙালি জনগোষ্ঠীকেই তিনি নিজের পরিবার বিবেচনা করতেন। এই মহান মনীষী ৩০জুন পূর্বদেশে দেশে জন্মেছিলেন। জন্মদিনে এই মনীষীর প্রতি অশেষ শ্রদ্ধা।

লেখক: পিএইচ ডি গবেষক ।

ছফার পরিবার ।। মোহাম্মদ আব্দুর রউফ Read More

মীর মশাররফ হোসেন

মীর মশাররফ হোসেন

বাংলা সাহিত্যের প্রথম বাঙালি মুসলিম নাট্যকার এবং প্রথম মুসলিম উপন্যাস রচয়িতা মীর মশাররফ হোসেন আধুনিক বাঙালি মুসলমান সাহিত্যিকদের পথিকৃৎ । সামগ্রিকভাবে তিনি উনিশ শতকের অন্যতম শ্রেষ্ঠ লেখক । ১৮৬৯ খ্রিস্টাব্দে তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘রত্নাবতী’ প্রকাশিত হয়। বিষয়বস্তু ও আঙ্গিক বিচারে তাঁর সাহিত্যকর্ম বিপুল ও বৈচিত্র্যময়। উপন্যাস, নাটক, প্রহসন, কবিতা, আত্মজীবনী, জীবনচরিত, ধর্ম-সাহিত্য সব রকম বিষয়েই লিখেছেন তিনি । তবে ‘বিষাদ সিন্ধু’ তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত ও জনপ্রিয় উপন্যাস । প্রথম প্রকাশের শতবর্ষ পরে, এখনও এটি পাঠক সমাদৃত। তিনি ১৯ ডিসেম্বর, ১৯১১ সালে পরলোকগমন করেন।

উদাসীন পথিকের মনের কথা কার রচনা ? এটি কোন ধরনের সৃষ্টিকর্ম ?

উদাসীন পথিকের মনের কথা রচনা করেছেন মীর মশাররফ হোসেন । এটি লেখকের আত্মজীবনীমূলক ও প্রত্যক্ষ নির্ভর উপাখ্যান । ১৮৯০ সালে প্রকাশিত এই গ্রন্থে নীলকরদের অত্যাচারের ভয়াবহ চিত্র এবং পরিণতি তুলে ধরা হয়েছে । এতে আছে দুঃখী জীবনের প্রতি অকৃত্রিম সহানুভূতি । হিন্দু – মুসলমানের সঙ্গবদ্ধ সংগ্রামের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ । এ রচনায় লেখকের সৃষ্টিশীল শিল্পচেনার মহত্তর পরিচয় পাওয়া যায় ।

বিষাদসিন্ধু  গ্রন্থের জনপ্রিতার কারণ কী?

মীর মশাররফ হোসেন রচিত বিষাদসিন্ধু বাংলা সাহিত্যের একমাত্র গদ্য মহাকাব্য । এটি মূলত ইতিহাস আশ্রিত রচনা । মহানবী (সা.) এর দৌহিত্র ইমাম হোসেনের সঙ্গে দামেস্ক অধিপতি এজিদের যুদ্ধে ইমাম হোসেনের বেদনাদায়ক মৃত্যুই এই রচনার উপজীব্য। ইসলাম ধর্ম সংশ্লিষ্ট স্পর্শকাতর বিষয় হওয়ায় এটি মুসলমানদের কাছে জনপ্রিয় হয়েছে । এছাড়া চিত্তাকর্ষক রচনাগুণ গ্রন্থটি জনপ্রিয় হওয়ার অন্যতম কারণ ।

মীর মশাররফ হোসেন রচিত তিনটি নাটক ও তিনটি পরিচয় ।

মীর মশাররফ হোসেন বাংলা গদ্যসাহিত্যে মুসলিম লেখক হিসেবে সবিশেষ গুরুত্বের অধিকারী। সাহিত্যের অপরাপর ক্ষেত্রে তাঁর কৃতিত্বের সঙ্গে বাংলা নাটক রচনায়ও তাঁর প্রতিভা সমধিক বিকশিত হয়েছে । মীর মশাররফ হোসেন রচিত নাটক ও প্রহসনগুলো তৎকালীন সমাজ ও সংস্কৃতির অনন্য দলিল । নিম্নে তাঁর তিনটি নাটক ও তিনটি প্রহসনের নাম দেওয়া হলো :
নাটক : ১. বসন্তকুমারী, ২. জমিদার দর্পণ ও ৩. বেহুলা গীতাভিনয় ।
প্রহসন : ১. এর উপায় কি , ২. ভাই ভাই এইতো চাই ও ৩. ফাঁস কাগজ ।

মীর মশাররফ হোসেন রচিত তিনটি কাব্য ও তিনটি উপন্যাসের পরিচয় দাও ।

মীর মশাররফ হোসেন বাংলা সাহিত্যের আধুনিক যুগে প্রথম উল্লেখযোগ্য মুসলিম সাহিত্যিক । তাঁর বহুমুখী প্রতিভার বলে মুসলিম রচিত বাংলা সাহিত্য বিশেষভাবে সমৃদ্ধ হয়েছে । তিনি উপন্যাস, প্রহসন, কাব্য ও প্রবন্ধ প্রভৃতি সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় কৃতিত্ব দেখিয়েছেন । নিম্নে তাঁর তিনটি উপন্যাস ও তিনটি কাব্যের নাম দেওয়া হলো : উপন্যাস : ১. রত্নাবতী , ২. বিষাদসিন্ধু ও ৩. উদাসীন পথিকের মনের কথা । কাব্য : ১. গোরাই ব্রীজ , ২. প্রেম পারিজাত ও ৩. মৌলুদ শরীফ ।

বিষাদ সিন্ধু  উপন্যাসের নামের তাৎপর্য  সংক্ষেপে আলোচনা ।

বিষাদ সিন্ধু মীর মশাররফ হোসেনের অমর সৃষ্টি। কারবালার ঐতিহাসিক কাহিনী অবলম্বনে রচিত এ উপন্যাসের বিষয়বস্তু মর্মান্তিক ও বিষাদময় । ঔপন্যাসিক কারবালার এ বিষাদময় করুণ কাহিনীকে আরও বিষাদময় করে ফুটিয়ে তুলেছেন । উপাখ্যানের মূল বিষয় হিসেবে ইতিহাসের পাশাপাশি সুগভীর জীবনবোধ চিত্রিত হয়েছে । নিয়তির নির্মমভায় মানবভাগ্যের উপর নেমে এসেছে করুণ পরিণতি । এ করুণ পরিণতি পাঠকের চিত্তকে আবেগে আপ্লুত করে । পাঠক কাহিনীর যত গভীরে যায় ততই মন বিষাদময়তায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে । ঔপন্যাসিক ভয়াবহ এ পরিণতির রূপকে সিন্ধুর সাথে তুলনা করে এ নামকরণ করেছেন ।
এজিদ কে ?
মীর মশাররফ হোসেনের উপন্যাস তথা বাংলা সাহিত্যের একমাত্র গদ্য মহাকাব্য বিষাদ সিন্ধুতে এজিদের পরিচয় পাওয়া যায় । এজিদ ছিল দামেস্ক অধিপতি মুয়াবিয়ার একমাত্র পুত্র । হযরত মুহাম্মদ ( সাঃ ) -এর দৌহিত্র ইমাম হোসেনের সাথে কারবালা প্রান্তরে এজিদের সেনাদের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ হয় ।

আত্মজৈবনিক উপন্যাস কাকে বলে ? একটি আত্মজৈবনিক উপন্যাসের বিষয়বস্তু লিখুন ।

রচয়িতার নিজের কাহিনী যখন উপন্যাসের চরিত্রের মধ্য দিয়ে প্রকাশিত হয় এবং কাহিনী এগিয়ে চলে তাকে আত্মজৈবনিক উপন্যাস বলে । মীর মশাররফ হোসেনের ‘উদাসীন পথিকের মনের কথা’ বাংলা সাহিত্যের বিখ্যাত আত্মজৈবনিক উপন্যাস । ‘উদাসীন পথিকের মনের কথা’ ( ১৮৯০ ) গ্রন্থে নীলকর অত্যাচারের কাহিনী রূপায়ণের সঙ্গে উপন্যাসের বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান । আত্মজীবনীমূলক এ গ্রন্থে সে আমলের নীলকরদের ভয়াবহ অত্যাচারের চিত্র এবং তার পরিণতি প্রতিফলিত হয়েছে । গ্রন্থে মীর মশাররফ হোসেন ‘উদাসীন পথিক’ ছদ্মনাম অবলম্বন করেছিলেন । সামাজিক শ্রেণি সংঘাতের চিত্র এখানে স্পষ্ট । নীলকরদের অত্যাচারের চিত্র বর্ণনায় লেখকের যথেষ্ট সার্থকতা ফুটে উঠলেও গল্পরস মাধুর্যমণ্ডিত হয়নি ।

বসন্তকুমারী’ নাটকের বিষয়বস্তু কী ?

মীর মশারফ হোসেনের নাটকগুলোর মধ্যে ‘বসন্তকুমারী নাটক’ (১৮৭৩) বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য । মুসলমান নাট্যকার রচিত প্রথম হিসেবে এর গুরুত্ব বিদ্যমান । ইন্দ্রপুরে বিপত্নীক রাজার বৃদ্ধ বয়সে যুবতী-স্ত্রী গ্রহণ, রাজার যুবক পুত্রের প্রতি বিমাতার আকর্ষণ এবং প্রেমনিবেদন, পুত্রের প্রত্যাখ্যান এবং বিমাতার ষড়যন্ত্র, পরিশেষে রাজপরিবারের সকলের মৃত্যু-এ কাহিনী অবলম্বনে ‘বসন্তকুমারী নাটক’ রচিত ।

গাজী মিয়ার বস্তানী ‘ গ্রন্থের পরিচয় দিন ।

গাজী মিয়ার বস্তানী’ মীর মশাররফ হোসেনের আত্মজীবনীমূলক রসরচনা জাতীয় গ্রন্থ। গাজী মিয়া লেখকের ছদ্মনাম। চব্বিশ নথি বা পরিচ্ছেদ সম্বলিত দুই খণ্ডে সমাপ্ত এই গ্রন্থে গাজী মিয়ার আত্মপরিচয়, বস্তানীপ্রাপ্তির বিবরণ, অপর হস্তে অর্পনের কারণ, ফলশ্রুতি, পরিমাণ এবং সবশেষে গাজী মিঞার বিদায় – প্রভৃতি বিবরণের পরিপ্রেক্ষিতে তৎকালীন কলুষিত সমাজের চিত্র অঙ্কিত হয়েছে । এই গ্রন্থটিকে পরিবেশের প্রতি বীতশ্রদ্ধ ও রুগ্ন মীরমানসের এক প্রতিশোধাত্মক ‘দপ্তর’ বলে অভিহিত করা যায় ।

গদ্য মহাকাব্য কাকে বলে ? একটি গদ্য মহাকব্যের পরিচয় দিন ।

যে উপন্যাসধর্মী রচনা গদ্যে বিকাশ লাভ করে অথচ তার বাক্যগুলোতে এক ধরণের কাব্যিক ছন্দ পরিলক্ষিত হয় – এ ধরনের উপন্যাস কে গদ্য মহাকাব্য বলে । বাংলা সাহিত্যের একমাত্র গদ্য মহাকাব্য মীর মশাররফ হোসেনের ‘বিষাদ সিন্ধু’ । বিষাদসিন্ধু মূলত ইতিহাস আশ্রিত রচনা । মহানবী (সা.) এর দৌহিত্র ইমাম হোসেনের সঙ্গে দামেস্ক অধিপতি এজিদের যুদ্ধে ইমাম হোসেনের বেদনাদায়ক মৃত্যুই এই রচনার উপজীব্য । ইসলাম ধর্ম সংশ্লিষ্ট স্পর্শকাতর বিষয় হওয়ায় এটি মুসলমানদের কাছে জনপ্রিয় হয়েছে।
মীর মশাররফ হোসেন Read More

মাইকেল মধুসূদন দত্ত

মাইকেল মধুসূদন দত্ত

২৫ জানুয়ারি, ১৮২৪ সালে যশোর জেলার কেশবপুর থানাধীন সাগরদাঁড়ি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। সাগরদাঁড়ি গ্রাম কপোতাক্ষ নদের তীরে অবস্থিত । তাঁকে বাংলা সাহিত্যের প্রথম বিদ্রোহী কবি বলা হয় । মাইকেল মধুসূদন দত্ত বাংলা সাহিত্যের এক অসাধারণ প্রতিভাধর কবি। তিনি আধুনিক বাংলা কবিতার জনক। তাঁর সমগ্র জীবন ঘটনাবহুল ও অত্যন্ত নাটকীয়। হিন্দু কলেজে অধ্যয়নকালে ইংরেজি সাহিত্যের প্রতি সৃষ্টি হয়েছিল তাঁর তীব্র অনুরাগ। খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করায় তাঁর নামের আগে মাইকেল শব্দটি যুক্ত হয় । মধুসূদন গ্রিক, ল্যাটিন, হিব্রু, ফরাসি, জার্মানি, ইতালিসহ প্রায় ১৩/১৪ টি ভাষা শিখেছিলেন এবং পাশ্চাত্য চিরায়ত সাহিত্য অধ্যয়ন করেছিলেন ।

মধুসূদন দত্ত সাহিত্যচর্চার শুরুতে ইংরেজি ভাষায় গ্রন্থ রচনা করেন। পরে তাঁর ভুল ভাঙলে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে অবদান রেখে চিরস্মরণীয় হন । মধুসূদন অমিত্রাক্ষর ছন্দ প্রবর্তন করে বাংলা কাব্যে বৈপ্লবিক পরিবর্তন সূচিত করেন । তাঁর বিখ্যাত ‘মেঘনাদবধ কাব্য’ বাংলা ভাষার প্রথম সার্থক মহাকাব্য । তিনি ২৯ জুন, ১৮৭৩ সালে মৃত্যুবরণ করেন ।

পৌরাণিক নাটক : শর্মিষ্ঠা (১৮৫৯), পদ্মাবতী (১৮৬০) ।
ঐতিহাসিক নাটক : কৃষ্ণকুমারী (১৮৬১)
সামাজিক প্রহসন : একেই কি বলে সভ্যতা? ও বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ (১৮৬০)
অসম্পূর্ণ নাটক : মায়াকানন (১৮৭৮)

কাব্য :

আখ্যান কাব্য : তিলোত্তমাসম্ভর কাব্য (১৮৬০)
মহাকাব্য : মেঘনাদবধ কাব্য (১৮৬১)
খণ্ড কাব্য : ব্রজাঙ্গনা (১৮৬১)
পত্রকাব্য : বীরাঙ্গনা (১৮৬২)
সনেট : চতুর্দশপদী কবিতাবলী (১৮৬৬)

বাংলা সাহিত্য গগনে মাইকেল মধুসূদন দত্তের ( ১৮২৪-৭৩ ) আবির্ভাব হয়েছিল নাট্য রচনার মাধ্যমে । পরবর্তীকালে তার বিস্ময়কর প্রতিভার দ্যুতি অধিকতর বৈচিত্র্যমুখর হয়ে ওঠে । কাব্যগ্রন্থ , প্রহসন , মহাকাব্য ও সনেট রচনায় তাঁর অমিত প্রতিভার পরিচয় বিধৃত রয়েছে । বাংলা মহাকাব্য ধারায় তিনি নবদিগন্তের সূচনা করেন । তাঁর রচিত ‘ মেঘনাদবধ কাব্য ‘ বাংলা সাহিত্যে প্রথম মহাকাব্য । ১৮৬১ সালে প্রকাশিত এ মহাকাব্যের আখ্যান , ট্রাজেডি ও কাহিনীর নবরূপায়ণ আমাদের চিত্তকে আন্দোলিত না করে পারে না । পরবর্তী পর্যায়ে তিনি ‘ তিলোত্তমাসম্ভব কাব্য ‘ , বীরাঙ্গনা , ব্রজাঙ্গনা প্রভৃতি নামে কাব্য রচনা করেন । এগুলোর কাহিনী মধ্যযুগের সীমাকে অতিক্রম করে বর্তমান যুগেও সমানভাবে জনপ্রিয় ।

মধুসূদন দত্তের একটি মহাকাব্য, একটি পত্রকাব্য ও একটি নাটকের নাম লিখুন ।

মহাকাব্য মেঘনাদবধ কাব্য (১৮৬১) পত্রকাব্য– বীরাঙ্গনা কাব্য (১৮৬২ ) নাটক–শর্মিষ্ঠা (১৮৫৯)

চতুর্দশপদী কবিতাবলী- গ্রন্থের পরিচয় দিন ।

বাংলা সাহিত্যের প্রথম সনেট সংকলন ‘ চতুদর্শপদী কবিতাবলী’। এতে ১০২ টি কবিতা সংকলিত হয় । ‘বঙ্গভাষা’ বাংলা সাহিত্যের প্রথম সনেট কবিতা । সনেটে অষ্টক ও ষট্‌ক দুটি অংশ থাকে । বাংলা সনেটের জনক মাইকেল মধুসূদন দত্ত ।

বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে মাইকেল মধুসুদনই একমাত্র মহাকবি। ‘বিষয়টি সংক্ষেপে বুঝিয় দিন ।

বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে মহাকাব্যের ধারার সূত্রপাত করেন মাইকেল মধুসূদন দত্ত । ১৮৬১ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত মেঘনাদবধ কাব্যের মাধ্যমে মহাকাব্যের পূর্ণাঙ্গ রূপের অনবদ্য প্রকাশ ঘটে এবং বাংলা সাহিত্যে তা প্রথম এবং শ্রেষ্ঠ মহাকাব্য হিসেবে স্বীকৃতি পায় । মধুসূদন প্রবর্তিত পথরেখায় হেমচন্দ্র , নবীন সেন , কায়কোবাদ প্রমুখ মহাকবির আবির্ভাব হলেও অন্য কারও পক্ষে মাইকেলের মত শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করা সম্ভব হয়নি । মহাকবির অনন্য বৈশিষ্ট্য একমাত্র মাইকেল মধুসূদন দত্তের স্বভাবেই ছিল- একথা নিঃসন্দেহে বলা যায়।

* মধুসূদন শুধু বাংলা কাব্যেই আধুনিকতার পথপ্রদর্শক নন , তিনি প্রকৃতপক্ষে বাংলা নাটকেরও মুক্তিদাতা ।’- আলোচনা করুন ।

বাংলা সাহিত্যের প্রথম সার্থক নাট্যকার হিসেবে মাইকেল মধুসূদন দত্তের স্থান সবিশেষ গুরুত্বপূর্ণ । কাব্য রচনার পাশাপাশি তিনি বেশ কিছু নাটকও রচনা করেছেন । তাঁর প্রথম নাটক ‘ শর্মিষ্ঠা’ ( ১৮৫৯ ) বাংলা নাটকে প্রাণ সঞ্চার করতে সক্ষম হয় । মধুসূদন পূর্ববর্তী নাটকে কৌতুকরসের বাহুল্য, রচনার গুরুভার ইত্যাদি ত্রুটি বিদ্যমান ছিল । কিন্তু মধুসূদন বাংলা নাটককে উদ্দেশ্যহীন গতি থেকে মুক্তি দিয়ে কাহিনী বিন্যাস , ঘটনার সংস্থাপনা এবং কৌতুক রসের সুষ্ঠু ব্যবহারের মাধ্যমে এক নতুন জীবন দান করতে সক্ষম হয়েছিলেন । বাংলা কাব্যে কাহিনী বিন্যাস ও আঙ্গিক নির্মাণে তিনি যেমন দক্ষতা দেখিয়েছেন, একই সাথে আদর্শ গ্রহণ প্রভৃতির সমন্বয়ে বাংলা নাটকের মুক্তি ত্বরান্বিত করেছেন । প্রকৃতপক্ষে , মধুসূদন দত্তের হাতেই বাংলা নাটক মুক্তি লাভ করেছে ।

অমিত্রাক্ষর ছন্দের পরিচয় দিন ।

বাংলা ভাষায় অমিত্রাক্ষর ছন্দের প্রবর্তন করেন মাইকেল মধুসূদন দত্ত । ইংরেজ কবি মিল্টনের Blanck Verse- এর অনুকরণে তিনি এই ছন্দের প্রচলন করেন । অমিত্রাক্ষর অর্থ যেখানে অক্ষরের মিল নেই । অর্থাৎ যে চরণ শেষে অন্ত্যমিল নেই তাকে অমিত্রাক্ষর ছন্দ বলে । এই ছন্দেও অক্ষরবৃত্ত ছন্দের মতো ৮ ও ৬ মাত্রার পর্ববিন্যাস থাকে । তবে অমিত্রাক্ষর ছন্দের প্রধান বৈশিষ্ট্য চরণে যতি বা ছেদ ব্যবহার অনিবার্য নয় এবং এর অন্ত্যমিল থাকে না ।

মেঘনাদবধ কাব্যের পরিচয় দিন ।

রামায়ণের কাহিনী অবলম্বনে মধুসূদন রচিত ‘ মেঘনাদবধ কাব্য ‘ বাংলা সাহিত্যের প্রথম সার্থক মহাকাব্য । করুণরসের অমিত্রাক্ষর ছন্দে রচিত ‘ মেঘনাদবধ ‘ কাব্যের সর্গ সংখ্যা ৯ টি যেখানে তিন দিন ও দুই রাতের ঘটনা বর্ণিত । মেঘনাদবধ কাব্য অমিত্রাক্ষর ছন্দে রচিত । এতে ছেদ বা যতির মিল নেই এবং অন্ত্যমিলও নেই । ১৪ মাত্রার চরণবিশিষ্ট অমিত্রাক্ষর ছন্দে রচিত একাব্যে ভাবের প্রবহমানতা নেই ।

‘মেঘনাদ বধ’ কাব্যের সর্গ সংখ্যা কত এবং কী কী ?

দত্ত কুলোদ্ভব কবি মাইকের মধুসূদন দত্ত রচিত মেঘনাদবধ মহাকাব্যে নয়টি (৯ টি ) সর্গ আছে । সর্গগুলো নিম্নরূপ :

প্রথম সর্গ : অভিষেক
দ্বিতীয় সর্গ : অস্ত্রলাভ
তৃতীয় সর্গ : সমাগম
চতুর্থ সর্গ : অশোক বন
পঞ্চম সর্গ : উদ্যোগ
ষষ্ঠ সর্গ : বধ
সপ্তম সর্গ : শক্তি নির্ভেদ
অষ্টম সর্গ : প্রেতপুরী
নবম সর্গ : অন্তেষ্টেক্রিয়া ।

বাংলা নাটকের ইতিহাসে মধুসূদনের ভূমিকা আরোচনা করুন ।

১. প্রথম সার্থক বাংলা নাটক (শর্মিষ্ঠা) রচনা এবং বাংলা নাট্যসাহিত্যের যথাযথ পথ নির্দেশ করেন।
২. অলংকার শাস্ত্রের বন্দিদশা থেকে তিনিই বাংলা নাটকে মুক্তিদেন এবং প্রাচাত্য নাটকের আদর্শে বাংলা নাটকের আধুনিকতার সূত্রপাত করেন ।
৩. ঐতিহাসিক বিষয়ক বস্তুকে অবলম্বন করে তিনিই প্রথম নাটক রচনা করেন ।
৪. নাটকীয় উৎকর্ষ সৃষ্টিতেও তাঁর উল্লেখযোগ্য অবদান রয়েছে ।
৫. অভিনয় ও মঞ্চসজ্জার দিকটিকে তিনিই প্রথম যথাযথ গুরুত্ব দেন।
৬. যুগ ও সমাজ – সচেতন শিল্পী হিসেবে তিনি যুগের সমস্যা সীমাবদ্ধতা ও সংকট এবং সমাজীবনের রূপকে নাটকে তুলে ধরেছেন ।

বাংলা কবিতায় মুধুসূদনের অবদান উল্লেখ করুন ।

১. মধুসূদন বাংলা কাব্যের নতুন ইতিহাসের স্রষ্টা ।
২. আখ্যানকাব্য- মহাকাব্য ধারা এবং গীতিকবিতার ধারা, বাংলা কবিতার এ দুটি ধারাতেই মধুসূদন অনন্য সাধারণ অবদান রেখেছেন ।
৩. বাংলা সনেটের জন্ম মধুসূদনের হাতে।
৪. মধুসূদন নবনব আঙ্গিকে নতুন নতুন বিষয় বাংলা সাহিত্যে উপহার দিয়েছেন । প্রথম মহাকাব্য রচয়িতা তিনি। তিনিই প্রথম সনেটকার, প্রথম পত্রকাব্য লেখার কৃতিত্বও তাঁর ।
৫. কাব্যের প্রকরণগত দিক থেকেও মধুসূদন বিপ্লব সাধন করেছেন । অমিত্রাক্ষর ছন্দ্র সৃষ্টি করে বাংলা কাব্যে – ছন্দের যুক্তির পথ নির্দেশ করেছেন।

বীরাঙ্গনা কাব্যের যে কোনো একটি নারী চরিত্রের বৈশিষ্ট্য লিখুন ।

দত্তকুলোদ্ভব কবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত রচিত ‘বীরাঙ্গনা’- ইতালীয় কবি ওভিদের Heroides কাব্যের আদর্শানুসারে লিখিত পত্রকাব্য । এ কাব্যে কবি সরল ও আবেগময় ভাষায় নারী চরিত্রের বৈশিষ্ট্য বর্ণনায় তাঁর লিরিক ক্ষমতাটুকু উজার করে দিয়েছেন । এখানে কোন নারী নিষিদ্ধ প্রেমে উম্মাদিনী, কেউ প্রিয়সঙ্গ লাভের জন্য কামাতুরা , আবার কেউ দুর্বল ভীরু স্বামীর প্রতি তীব্র বাক্যবাণবর্ষণে অকৃপণা । এই কাব্যের একটি চরিত্র শকুন্তলা, সে দুষ্মন্তকে বলছে যে, দাসদাসী আমার সেবা করবে, আমার তেমন লোভ নেই । যেহেতু আমি বনে বাস করি, বাকল পরিধান করি এবং ফলমূল আহার করি, রাত্রে কুশাসনে শয়ন করি, তাই রাজ্য সুখ ভোগ করার লোভ নেই । এই চরিত্রের নির্লোভ শান্তশিষ্ট নারী চরিত্রের বৈশিষ্ট্য ফুটে উঠেছে।

বাংলা সাহিত্যে মাইকেল মধুসূদন দত্তের তিনটি অবদানের বর্ণনা করুন ।

মাইকেল মধুসূদন দত্ত বাংলা সাহিত্যের এক অসাধারণ প্রতিভাধর কবি । বাংলা সাহিত্য গগনে মাইকেল মধুসূদন দত্ত নবদিগন্তের সূচনা করেন । বাংলা সাহিত্যে মধুসূদনের তিনটি অবদান :
১. মধুসূদন বাংলা কাব্যের নতুন ইতিহাসের স্রষ্টা, প্রথম পত্রকাব্য লেখার কৃতিত্ব তাঁর ।
২. বাংলা সনেটের জন্ম মধুসূদনের হাতে, তাই তিনিই প্রথম সনেটকার ।
৩. মধুসূদন নবনব আঙ্গিকে নতুন নতুন বিষয় বাংলা সাহিত্যে উপহার দিয়েছেন। প্রথম মহাকাব্য রচয়িতাও তিনি ।

বাংলা কবিতায় প্রথম সনেট রচয়িতা হিসেবে কে স্বীকৃত ? তাঁর সনেট গ্রন্থের নাম কী ?

বাংলা কবিতায় প্রথম সনেট রচয়িতা হিসেবে স্বীকৃত মাইকেল মধুসূদন দত্ত । তাঁর সনেট গ্রন্থের নাম ‘ চতুর্দশপদী কবিতাবলী ‘ ।

মেঘনাদবধ কাব্য কোন রস প্রধান?

‘মেঘনাদবধ’ কাব্যে কবি মধুসূদন যদিও বীররসের প্রাধান্য দিতে চেয়েছিলেন, কিন্তু এ কাব্যে করুণরস প্রাধান্য পেয়েছে ।

বৈষ্ণব পদাবলী ও ব্রজাঙ্গনার পার্থক্য কী ?

বৈষ্ণব পদাবলী ও ব্রজাঙ্গনার পার্থক্য হলো : ব্রজাঙ্গনার রাধা মানবী এবং তার প্রেম মানবীয় প্রেম , বৈষ্ণব পদাবলীতে রাধা কৃষ্ণভক্ত ভগবান , প্রেম আধ্যাত্মিক ।

কোন নাটক দেখতে গিয়ে মধূসূদন বাংলা নাটক লিখতে অনুপ্রাণিত হন ?

বেলগাছিয়া থিয়েটারের রামনারায়ণ তর্করত্নের ‘ রত্নাবলী ‘ নাটক দেখতে গিয়ে মধূসূদন বাংলা নাটক লিখতে অনুপ্রাণিত হন ।

মধুসূদন পত্রকাব্য  রচনা করতে কোথা থেকে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন ?

ইতালীয় কবি ওভিদের হির ইদস কাব্য থেকে মধুসূদন পত্রকাব্য ‘ রচনা করতে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন ।

তিলোত্তমাসম্ভব কাব্যে প্রাচ্যের কোন কবির কোন কাব্যের প্রভাব রয়েছে ?

তিলোত্তমাসম্ভব ’ কাব্যে প্রাচ্যের কবি হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘ বৃত্রসংহার ‘ কাব্যের প্রভাব রয়েছে ।
মাইকেল মধুসূদন দত্ত Read More

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

বঙ্কিমচন্দ্র ২৬ জুন, ১৮৩৮ সালে পশ্চিম বঙ্গের চব্বিশ পরগনার কাঁঠালপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন । বঙ্কিমচন্দ্রের উপাধি ‘ সাহিত্য সম্রাট ‘ । এছাড়াও তাকে ‘ বাংলা উপন্যাসের জনক বলা হয় । তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বপ্রথম Graduate এবং পেশায় ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন । ‘ বঙ্গদর্শন নামে যে বিখ্যাত সাহিত্য পত্রিকার তিনি প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ছিলেন , বাংলা সাহিত্যের বিকাশে এবং শক্তিশালী লেখক সৃষ্টিতে তার অবদান অসামান্য । তিনি ৮ এপ্রিল , ১৮৯৪ সালে মৃত্যুবরণ করেন ।

বঙ্কিমচন্দ্রের সব উপন্যাসই রোমান্সমূলক’

বাংলা সাহিত্যের প্রথম সার্থক ঔপন্যাসিক বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (১৮৩৮-৯৪)। বাংলা সাহিত্যে তিনি রোমান্সমূলক উপন্যাসের স্রষ্টা । তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘দুর্গেশনন্দিনী’তে রোমান্সমূলক ধারার সূত্রপাত হয়েছে । চিন্তা-চেতনায় ইউরোপীয় আদর্শের অনুসারী বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর সাহিত্যে কল্পনা জগতের অবাধ বিচরণ ঘটিয়েছেন । তাঁর রচিত ‘কপালকুণ্ডলা’ বাংলা সাহিত্যের অসাধারণ রোমান্টিক উপন্যাস। এ রোমান্সের ধারা শেষ পর্যন্ত বিষবৃদ্ধ, কৃষ্ণকান্তের উইল, রজনী, মৃণালিনী, ইন্দিরা প্রভৃতি উপন্যাসেও অব্যাহত ছিল। এসব উপন্যাসে বাঙালির অতীত ইতিহাস যেমন স্থান পেয়েছে, তেমনি ব্যক্ত হয়েছে সমকালীন সমাজজীবনের কথা। উপন্যাসের আখ্যান বাস্তব জীবনকে ভিত্তিভূমি হিসেবে গ্রহণ করলেও বিস্ময়কর ও অলৌকিকের প্রতি তীব্র আকর্ষণ আছে । রোমান্স রচনায় ইতিহাস ও দৈবশক্তির সংমিশ্রণ ঘটিয়ে তার সাথে সংযুক্ত করেছেন রহস্যময় দৃঢ় ব্যক্তিত্বশালী মনুষ্যচরিত্র । ফলে তাঁর সব উপন্যাসেই নিগূঢ় ভাবসঙ্গতির রোমান্স ফুটে উঠেছে ।
বঙ্কিমচন্দ্রের ইতিহাস ও রোমান্সধর্মী উপন্যাস : দুর্গেশনন্দিনী, কপালকুঝলা, মৃণালিনী, চন্দ্রশেখর, রাজসিংহ, সীতারাম প্রভৃতি পরিমচন্দ্রের ইতিহাস ও রোমান্সধর্মী উপন্যাস |

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে বাংলা উপন্যাসের জনক বলা হয় কেন ?

উপন্যাসের প্রাথমিক প্রচেষ্টার বিচিত্র পরীক্ষা-নিরীক্ষার কালাতিক্রমের পর বাংলা সাহিত্যে প্রথম সার্থক উপন্যাস রচনার কৃতিত্ব বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের প্রাপ্য । বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর সাহিত্যিক জীবনে চৌদ্দটি উপন্যাস রচনা করেছেন । এসব উপন্যাসে বাঙালির অতীত ইতিহাস যেমন স্থান পেয়েছে , তেমনি ব্যক্ত হয়েছে সমকালীন সমাজজীবনের কথা । তাঁর উপন্যাসে বাস্তব জীবনকে ভিত্তিভূমি হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে এবং সেখানে অলৌকিকের প্রতি তীব্র আকর্ষণ বিদ্যমান রয়েছে । তাঁর উপন্যাসে রোমান্সের বৈশিষ্ট্য নিহিত আছে । রোমান্স রচনায় ইতিহাস , দৈবশক্তির সংমিশ্রণ ঘটিয়ে তার সাথে যুদ্ধ করেছেন রহস্যময় দৃঢ় ব্যক্তিত্বশালী মনুষ্যচরিত্র । (বঙ্কিম পূর্ববর্তী যুগে উপন্যাসের এত বহুমাত্রিক বিকাশ খুব বেশি লক্ষ করা যায় না । উপন্যাসের অবয়ব সমৃদ্ধ কিছু কিছু পুস্তক রচিত হয়েছে তবে উপন্যাসের সমস্ত লক্ষণ কেবল বঙ্কিমচন্দ্র রচিত উপন্যাসগুলোতেই প্রথম পাওয়া গেছে । এজন্যই তাঁকে বাংলা সাহিত্যের প্রথম সার্থক ঔপন্যাসিক বলা হয়ে থাকে ।

বঙ্কিমচন্দ্রের ব্যঙ্গরসাত্মক রচনাগুলো বাংলা সাহিত্যের গৌরবসর সংযোজন।

বভিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ( ১৮৩৮-১৮৯৪ ) বাংলা প্রবন্ধ সাহিত্যের ধারায় বিরাট প্রতিভা নিয়ে আবির্ভূত হন । তিনি বাংলা সমালোচনা সাহিত্যের অভূতপূর্ব সমৃদ্ধি সাধন করেন । তাঁর সমস্ত প্রবন্ধের বক্তবা পরিবেশনের গুণে সুস্পষ্ট ও মননদীও হয়ে উঠেছে । বঙ্কিমচন্দ্র তিন ধরনের প্রবন্ধগ্রন্থ রচনা করেছিলেন । যেমন-
১. ব্যঙ্গাত্মক ও সরস
২. জ্ঞান – বিজ্ঞান ও সমালোচনা বিষয়ক
৩. দর্শন ও শাচর্চাবিষয়ক ।
বঙ্কিমচন্দ্রের ব্যঙ্গরসাত্মক রচনাগুলো বাংলা সাহিত্যের গৌরবময় সংযোজন । এই প্রবন্ধগুলোতে বঙ্কিমচন্দ্র সমকালীন সমাজ , শিক্ষাদীক্ষা ও চারিত্রিক অসঙ্গতি কৌতুক রসের মধ্য দিয়ে চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন । এতে গুরুতর জত্ত্বকথাও সরল ও হৃদয়গ্রাহী হয়ে পড়েছে । ব্যাঘ্রাচার্য্য বৃহল্লাঙ্গুল, ইংরাজস্তোত্র, বাবু, গর্দভ, দাম্পত্য দণ্ডবিধির আইন প্রভৃতি ব্যঙ্গরসাত্মক রচনার উৎকৃষ্ট উদাহরণ । তবে ‘কমলাকান্তের দপ্তর’ (১৮৭৫) বঙ্কিমচন্দ্রের বিশিষ্ট ব্যঙ্গরসাত্মক রচনা। এ প্রবন্ধে তিনি আফিমখোর বৃদ্ধ ব্রাহ্মণের উক্তির মাধ্যমে পারিপার্শ্বিকতার ব্যঙ্গাত্মক চিত্র এঁকেছেন । তাঁর হাতে ব্যঙ্গবিদ্রূপ পেয়েছে এক ভিন্নমাত্রা।  বাংলা প্রবন্ধ সাহিত্যে তাঁর রচিত ব্যঙ্গরসাত্মক প্রবন্ধগুলো বিশিষ্ট স্থান অধিকার করেছে একথা নিঃসন্দেহে বলা যায় ।

বাংলা সাহিত্যের প্রথম সার্থক ঔপন্যাসিক হিসেবে বঙ্কিমচন্দ্রের কৃতিত্ব।

উপন্যাসের প্রাথমিক প্রচেষ্টার বিচিত্র পরীক্ষা-নিরীক্ষার কালাতিক্রমের পর বাংলা সাহিত্যে প্রথম সার্থক উপন্যাস রচনার কৃতিত্ব বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের প্রাপ্য। বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর সাহিত্যিক জীবনে চৌদ্দটি উপন্যাস রচনা করেছেন। এসব উপন্যাসে বাঙালির অতীত ইতিহাস যেমন স্থান পেয়েছে, তেমনি ব্যক্ত হয়েছে সমকালীন সমাজজীবনের কথা। তাঁর উপন্যাসে বাস্তব জীবনকে ভিত্তিভূমি হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে এবং সেখানে অলৌকিকের প্রতি তীব্র আকর্ষণ বিদ্যমান রয়েছে । তাঁর উপন্যাসে রোমান্সের বৈশিষ্ট্য নিহিত আছে । রোমান্স রচনায় ইতিহাস, দৈবশক্তির সংমিশ্রণ ঘটিয়ে তার সাথে যুদ্ধ করেছেন রহস্যময় দৃঢ় ব্যক্তিত্বশালী মনুষ্যচরিত্র । বঙ্কিম পূর্ববর্তী যুগে উপন্যাসের এত বহুমাত্রিক বিকাশ খুব বেশি লক্ষ করা যায় না । উপন্যাসের অবয়ব সমৃদ্ধ কিছু কিছু পুস্তক রচিত হয়েছে তবে উপন্যাসের সমস্ত লক্ষণ কেবল বঙ্কিমচন্দ্র রচিত উপন্যাসগুলোতেই প্রথম পাওয়া গেছে । এজন্যই তাঁকে বাংলা সাহিত্যের প্রথম সার্থক ঔপন্যাসিক বলা হয়ে থাকে ।

কপালকুগুলা চরিত্রের স্বরূপ নির্ণয়

কপালকুণ্ডলা বঙ্কিমচন্দ্র রচিত বাংলা সাহিত্যের প্রথম রোমান্টিক উপন্যাস । কপালকুণ্ডলা উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র। কপালকুগুলা অরণ্যে কাপালিকের কাছে প্রতিপালিত হয়েছে। সে সমাজের সংস্কার জানে না। নবকুমারের সঙ্গে তার প্রণয় ও পরিণয় এবং পরবর্তীতে সমাজ বন্ধনের সাথে জন্মই তার চরিত্রটিকে ফুটিয়ে তুলেছে । তার চরিত্র রহস্যময় । সে নবকুমারকে ভালবাসে , কাপালিক পরে তার শত্রু হয়ে যায়, কাপালিকের হাত থেকে নবকুমারকে বাঁচালেও মৃত্যুর মধ্য দিয়ে তার চরিত্রের রহস্যময়তাই পরিলক্ষিত হয় ।
কপালকুণ্ডলা’ উপন্যাসে দুটি ত্রিভুজ প্রেমের আভাস আছে-
১. মতিবিধি > নবকুমার > কপালকুগুলা
২. মতিবিধি > সেলিম > মেহেরুন্নেসা “
*কাপালিকের গৃহ হতে খাদ্যান্বেষণে বের হয়ে নরকুমার সমুদ্রপাড়ে গিয়ে বসলে কপালকুণ্ডলা নবকুমারকে ‘পথিক, তুমি পথ হারাইয়াছ ?  কথা বলেছিল ।

বাঙলা গদ্যে বঙ্কিমচন্দ্রের অবদান

১. বিদ্যাসাগরীয় ও আলালী রীতির সমন্বয় সাধন করে তাতে তিনি প্রাণ প্রতিষ্ঠা করেন এবং নিজের বৈশিষ্ট্যের ছাপ বসিয়ে দেন ।
২. বিচিত্র রচনাবলীর সাহায্যে বঙ্কিমচন্দ্র বাংলা ভাষাকে যথার্থ উৎকর্ষমণ্ডিত করেন ।
৩. গদ্য রচনার যে বিশেষ স্টাইল বা রীতি রয়েছে সেটা তিনিই প্রথম পরিপূর্ণভাবে তুলে ধরেন ।
৪. তাঁর সাহিত্য রচনায় ভাষা ভাবের বাহন থেকে রসের বাহনে উন্নতি হয়; বাঙালি পাঠক গদা সাহিত্য থেকে রসের তৃষ্ণা মেটাতে সক্ষম হয় ।
৫. প্রবন্ধ রচনায় তাঁর ভাষ্য মনীষার বাহন হয়ে ওঠে । ব্যঙ্গাত্মক ও সরল রচনা , জ্ঞান – বিজ্ঞান ও শাস্ত্র আলোচনা এবং মননশীল প্রবন্ধ ও বিশ্লেষণধর্মী আলোচনা সব বিষয়ের উপযোগী হয়ে ওঠে বাংলা গদ্য ।
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় Read More

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর

২৬ সেপ্টেম্বর , ১৮২০ সালে মেদিনীপুর জেলার বীরসিংহ গ্রামে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর জন্মগ্রহণ করেন ।  পৈতৃক পদবি  বন্দ্যোপাধ্যায়  । শিল্পসম্মত বাংলা গদ্যরীতির জনক ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাচর্চা ও পাণ্ডিত্যের স্বীকৃতি হিসেবে ১৮৪০ সালে সংস্কৃত কলেজ থেকে বিদ্যাসাগর  উপাধি পান । তিনি ঈশ্বরচন্দ্র শর্মা নামে স্বাক্ষর করতেন । আজও সমগ্র বাঙালি সমাজে তিনি  বিদ্যাসাগর  উপাধিতেই সর্বজন পরিচিত । তিনি ২৯ জুলাই  ১৮৯১ সালে মৃত্যুবরণ করেন । বাংলা গদ্যসাহিত্য বিকাশে বিদ্যাসাগরের অবদান মূল্যায়ন করতে গিয়ে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন ‘ বিদ্যাসাগর বাংলা ভাষার যথার্থ শিল্পী ছিলেন ।

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকে কেন বাংলা গদ্যের জনক বলা হয় ?

বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের বিবর্তনের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর । পাণ্ডিত্যের গভীরতায়, মানসিকতার উদারতায়, সমাজ সংস্কারের তৎপরতায় তাঁর যে চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য প্রকাশ পেয়েছে, তা এদেশের সমাজ-সংস্কৃতির ইতিহাসে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে গ্রাহ্য । বাংলা গদ্যের অবয়ব নির্মাণে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বিশিষ্ট ভূমিকা পালন করেছিলেন । গদ্যের অনুশীলন পর্যায়ে বিদ্যাসাগর সুশৃঙ্খলা, পরিমিতিবোধ ও ধ্বনি প্রবাহে অবিচ্ছিন্নতা সঞ্চার করে বাংলা গদ্যরীতিকে উৎকর্যের এক উচ্চতর পরিসীমায় উন্নীত করেন । তাঁরই বলিষ্ঠ প্রতিভার জাদুস্পর্শে বাংলা পূর্ণ সাহিত্যিক রূপ অধিগ্রহণ করেছে । গদ্য অস্থির গতি অতিবাহিত করে স্থিরতার পর্যায়ে পৌঁছেছে । গদ্যচর্চার ব্যাপক অনুশীলনের মাধ্যমে গদ্যের সমস্ত জটিলতা দূরীভূত হয়েছে । গদ্যের সাবলীল রূপ দিয়ে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বাংলা সাহিত্যে অমর হয়ে আছেন । গদ্য সৃষ্টির প্রাথমিক পর্যায়ে শৃঙ্খলা, পরিমিতিবোধ ও যতি চিহ্নের মাধ্যমে বাংলা গদ্যের অবয়ব নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার জন্যে ঈশ্বরচন্দ্রকে ‘ বাংলা গদ্যের জনক ‘ বলা হয় ।

সাহিত্যকর্ম ও সমাজকর্ম এ দুইয়ের মধ্যে কোনটির জন্য বিদ্যাসাগর অধিক সুপরিচিত ?

বাংলা গদ্যের অবয়ব নির্মাণে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান যেমন অপরিসীম তেমনি সমাজ সংস্কারেও বিদ্যাসাগর অনস্বীকার্য । বিদ্যাসাগরের সাহিত্য সাধনার পশ্চাতে সমাজসেবকের মনোবৃত্তি কার্যকরী ছিল । তিনি ছিলেন নিয়মনিষ্ট, ইংরেজি শিক্ষার প্রতি তার পৃষ্ঠপোষকতা ছিল, তিনি বাল্যবিবাহের বিরোধিতা করেছেন, বিধবাবিবাহের জন্য সর্বস্ব পণ করেছিলেন এবং নিজের আদর্শকে চিরদিন সমুন্নত রেখেছেন । ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের সমাজ সম্পর্কিত প্রবন্ধ গ্রন্থগুলোর মধ্যে ‘বিধবাবিবাহ প্রচলিত হওয়া উচিত কি না এতদ্বিষয়ক প্রস্তাব’ এবং ‘বহু বিবাহ রহিত হওয়া উচিত কিনা এতদ্বিষয়ক বিচার’ উল্লেখযোগ্য । হিন্দু সমাজের আবহমানকালের অনুসৃত হৃদয়বিদারক অনাচারগুলো বিদ্যাসাগরের মনকে সহানুভূতিশীল করে তুলেছিল । তাঁর রচনাবলিতে সে নিদর্শন বিদ্যমান ।

সাহিত্য ও সমাজকর্ম – এ দুটি বিষয়েই বিদ্যাসাগরের রয়েছে সরব পদচারণা । সাহিত্যের খ্যাতি যেমন তাকে প্রসিদ্ধ করেছে তেমনি সমাজসংস্কারের অদম্য প্রচেষ্টা তাঁকে সমাজ সংস্কারক হিসেবে সুপরিচিত করেছে । তবে বিদ্যাসাগর মূলত সমাজ সংস্কারক হিসেবেই বাঙালি সমাজে অবিস্মরণীয় ।

বিদ্যাসাগর বাংলা ভাষার প্রথম যথার্থ শিল্পী

বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের বিবর্তনের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর (১৮২০-১১) । তিনি গদারীতির মধ্যে লালিত্য সঞ্জার ও নমনীয়তা প্রণয়নপূর্বক ভাষারীতি হিসেবে গদ্যের মধ্যে প্রাণচাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে গৌরবময় অগ্রগতি সাধন করেন । বাংলা ভাষার অন্তর্নিহিত ধ্বনিপ্রবাহ অনুধাবন করে বাক্যে স্বাভাবিক শব্দানুবৃত্তির রূপ প্রদানপূর্বক গদ্যরীতিতে পরিমিতিবোধ সৃষ্টি করেন । বিদ্যাসাগরের পার্বও অনেক লেখক ভাষার সুষম বিকাশ সাধনে সচেষ্ট ছিলেন কিন্তু বিদ্যাসাগরের প্রচেষ্টা ছিল অদম্য। বস্তুতপক্ষে বিদ্যাসাগরের সৃষ্ট গদ্যরীতির প্রভাবেই পরবর্তী পর্যায়ে বাংলা গদ্যে পরিণত রূপের সৃষ্টি হয়। এজন্যই তাঁকে বাংলা ভাষার প্রথম যথার্থ শিল্পী হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়।

বিদ্যাসাগরের মৌলিক রচনা

১. বিধবাবিবাহ প্রচলিত হওয়া উচিত কিনা এতদ্বিষয়ক প্রস্তাব (১৮৫৫ )
২. বহু বিবাহ রহিত হওয়া উচিত কিনা এতদ্বিষয়ক বিচার (১৮৫৫)
৩. অতি অল্প হইল (১৮৭৩)
৪. আবার অতি অল্প হইল ( ১৮৭৩)
৫. ব্রজবিলাস (১৮৮৫)
৬. প্রভাবতি সম্ভাষণ (১৮৯১)
৭. রচিত জীবনচরিত (১৮৯১) ।

* ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর রচিত ‘প্রভাবতী সম্ভাষণ’ একটি শোকগাঁথা । এটি একটি মৌলিক রচনা । যার বালিকা কন্যা প্রভাবতীর অকাল মৃত্যুর শোকে বিদ্যাসাগর এটি রচনা করেন ।

* বিধবা বিবাহ প্রচলিত হওয়া উচিত কি না এতদ্বিষয়ক প্রস্তাব গ্রন্থে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বিধবা বিবাহের পক্ষে যুক্তি প্রদর্শন করেন ।

বিদ্যাসাগরের অনুবাদ গ্রন্থ

১. বেতাল পঞ্চবিংশতি ( ১৮৪৭ )
২ . শকুন্তলা ( ১৮৫৪ )
৩. সীতার বনবাস ( ১৮৬০ )
৪. ভ্রান্তি বিলাস ( ১৮৬৯ )
* হিন্দি ভাষায় লালুজি রচিত ‘ বৈতাল পৈচিচসি ‘ অবলম্বনে বিদ্যাসাগর ‘ বেতাল পঞ্চবিংশতি ‘ রচনা করেন । এটি বাংলা ভাষার প্রথম কাহিনীধৰ্মী গ্রন্থ ।  প্রথম বিরাম বা যতি চিহ্নের প্রথম সফল প্রয়োগ করেন  এই গ্রন্থে ।

বাংলা গদ্য সাহিত্যে বিদ্যাসাগরের অবদান মূল্যায়ন 

যাঁর হাতের ছোঁয়ায় বাংলা গদ্য রূপময় হয়ে ওঠে, তিনি ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। গদ্যের অনুশীলনী পর্যায়ে বিদ্যাসাগর সুশৃঙ্খলা, পরিমিতিবোধ ও ধ্বনিপ্রবাহে অবিচ্ছিন্নতা সঞ্চার করে বাংলা গদ্যরীতিকে উৎকর্ষের এক উচ্চতর পরিসীমায় উন্নীত করেন । বাংলা সাহিত্যে বিদ্যাসাগরের অবদান নিম্নভাবে মূল্যায়ন করা যায়:
১. বাংলা গদ্যের পালিতা ও নমনীয়তা দান করে বিদ্যাসাগর বাংলা গদ্যের সাহিত্যিকরূপ নির্মাণ করেন।
২. বিদ্যাসাগর বাংলা গদ্যের পদবিন্যাস রীতি বিশুদ্ধভাবে নির্ধারণ ও প্রয়োগ করেন ।
৩.পূর্ববর্তী পদ্যে যতিস্থাপন ছিল বিরল, বিরাম চিহ্নের যথাযথ ব্যবহার নির্দেশ করে তিনিই প্রথম বাংলা পদ্যের নিজস্ব ছদরূপটি আবিষ্কার করেন ।
৪. গদ্যে প্রবাদ প্রবচন ব্যবহার করে তিনি ভাষাকে সমৃদ্ধ, সরল ও আকর্ষণীয় করে তোলেন।

বালিকা বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে বিদ্যাসাগরের অবদান

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর সাহিত্যিক হিসেবে যতটা পরিচিত, সমাজসংস্কারক হিসেবেও সমধিক পরিচিত । শিক্ষা বিস্তারে বিশেষত নারী শিক্ষা বিস্তারে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য । তিনি মেয়েদের শিক্ষার সুযোগ করে দিতে ৩৫ টি বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করেন। শিক্ষা বিস্তারে তাঁর এই আগ্রহ লক্ষ করে ছোট লাট ফ্রেডারিক হ্যালিডে তাকে দক্ষিণাঞ্চলের স্কুলসমূহের বিশেষ পরিদর্শক নিযুক্ত করেন । এসময় তিনি আরও ২০ টি মডেল স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন । তিনি কলকাতায় বেথুন কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন । কর্তৃপক্ষের সাথে মতবিরোধ হওয়ায় তিনি ১৮৫৮ সালে সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষের পদ থেকে অবসর গ্রহণ করেন ।

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের ছদ্মনাম

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ‘কস্যাচিৎ উপযুক্ত ভাইপোস্য’ ছদ্মনামে লিখেছেন চারটি গ্রন্থ রচনা করেন-
১. অতি অল্প হইল (১৮৭৩)
২. আবার অতি অল্প হইল (১৮৭৩)
৩. ব্রজবিলাস (১৮৮৫)
৪. রত্নপরীক্ষা (১৮৮৬)
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর Read More