স্বদেশের উপকারে নাই যার মন কে বলে মানুষ তারে? পশু সেই জন। ভাব-সম্প্রাসারণ

স্বদেশের উপকারে নাই যার মন
কে বলে মানুষ তারে? পশু সেই জন।

ভাব-সম্প্রাসারণ : স্বদেশপ্রেমের মধ্য দিয়েই মানুষের মহত্ত্বের মহিমা ফুটে উঠে। স্বদেশের উপকারে যে মানুষ এগিয়ে আসে না সে বিবেকবর্জিত অমানুষ, সে পশুর সমতুল্য।

পৃথিবীর প্রতিটি মানুষই তার জন্মভূমিকে প্রাণের চেয়ে ভালবাসে। দেশ ও জাতির সেবায় নিজেকে উৎসর্গ করে। এর মধ্যেই মানব জীবনের সার্থকতা। একজন মানুষ যতই ধনবান, রূপবান, জ্ঞানবান, ক্ষমাতাধর হোক না কেন তার যদি দেশপ্রেম না থাকে, তাহলে তার অর্থ-যশ খ্যাতি সবই বৃথা। মানুষ হিসাবে জন্মগ্রহণ করলেই একজন মানুষ প্রকৃত মানুষ হয় না। তার ভেতরে যদি মানবীয় গুণাবলি না থাকে তবে সে নামেই মানুষ, প্রকৃত মানুষ নয়। তখন তাকে একটি পশুর সাথে তুলনা করা যায়। কেননা, পশুও জন্মগ্রহণ করে, খাদ্য খায়, জন্ম দেয় এবং পরিশেষে মারা যায়। পশু ও মানুষের মধ্যে পার্থক্য এই যে, পশুর মধ্যে কোন মহৎ গুণাবলি নাই, কিন্তু মানুষের মধ্যে আছে। যার মধ্যে মনুষত্বের গণুাবলি আছে সে-ই প্রকৃত মানুষ। মহৎ গুণ হচ্ছে দেশপ্রেম বা স্বদেশের উপকার করার ইচ্ছা। যারা নিঃস্বার্থভাবে দেশকে ভালবাসে এবং দেশ ও জাতির কল্যাণে নিজেকে উৎসর্গ করে প্রকৃতপক্ষে তারাই মানুষ। দেশপ্রেমিক তারাই। তারা যুগে যুগে, চিরকালের জন্য জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলের কাছে চিরস্মণীয় হয়ে থাকে। পক্ষান্তরে, যারা দেশকে ভালবাসে না, নিজেদের স্বার্থোদ্ধারের জন্য দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, সম্মান ও গৌরবকে পদদলিত করে; দেশের সম্পদ শত্রুদের নিকট পাচার করে দেশ দেশদ্রোহী বিভিন্ন কাজে লিপ্ত হয় তারা মানুষ নয়, তারা পশুর চেয়েও অধম।

তাই, দেশপ্রেমহীন মানুষ পশুর মতোই। দেশের কল্যাণের চেয়ে আত্মস্বার্থকে বড় করে দেখে। অন্যদিকে, যাদের মধ্যে দেশপ্রেম আছে তারা দেশের কল্যাণে আত্মোৎসর্গ করে ধন্য হয়।

স্বদেশের উপকারে নাই যার মন কে বলে মানুষ তারে? পশু সেই জন। ভাব-সম্প্রাসারণ Read More

অন্যায় যে করে অর অন্যায় যে সহে || ভাব-সম্প্রসারণ

অন্যায় যে করে অর অন্যায় যে সহে / তব ঘৃণা তারে যেন তৃণসম দহে।

ভাব-সম্প্রাসরণ: অন্যায়কারী যেমন অপরাধী বলে বিবেচিত হয়, তেমনি অন্যায়কারীর ভয়ে প্রতিবাদ না করে যারা নীরবে অন্যায় সহ্য করে, তারাও অন্যাকারীর মতো সমান অপরাধে অপরাধী।

মানুষকে একটি রাষ্ট্রিয় কাঠামোর মধ্যে সমাজবদ্ধ হয়ে বসবাস করতে হয়। রাষ্ট্র মানুষের জন্য কিছু আইন প্রণয়ন করে। এসব আইন-কানুন, প্রথা মানুষকে মান্য করে চলতে হয়। এগুলোর কোন একটি লঙ্ঘন করাই হচ্ছে অন্যায় বা অপরাধ। অন্যভাবে বলা যায়, স্বাভাবিক বিবেক-বুদ্ধির পরিপন্থি কিংবা ন্যায়ের পরিপন্থি কোন কাজ করাই হলো অন্যায়। কেউ অন্যায় কাজ করবে এটি কোন সুস্থ মানুষের বা সমাজের কাম্য হতে পারে না। তাই অন্যায়কারীকে সবাই ঘৃণার চোখে দেখে। বিধাতার নিকটও একজন অন্যায়কারী সর্বদাই ঘৃণ্য এবং তার জন্য কঠিন শাস্তির ব্যবস্থা থাকে।

কিন্তু অন্যায়কারীকে যারা প্রশ্রয় দেয় তারাও কোনো অংশে কম অপরাধী নয়। ক্ষমা একটি মহৎ গুণ এ বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। কারো অপরাধ বা অন্যায় আচরণ ক্ষমা করার মধ্যে নিঃসন্দেহে বড় ধরনের কৃতিত্ব নিহিত আছে। তবে যে অপরাধ সমাজের বিরুদ্ধে সংঘটিত হয়, অথবা একটি জনগোষ্টির বিরুদ্ধে করা হয় অথবা এর দ্বারা একাধিক মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়; সেক্ষেত্রে একজন ব্যক্তির তা ক্ষমা করার কোন অধিকার নেই। এক্ষেত্রে অন্যায়কারীকে প্রশ্রয় দেওয়ার অর্থ হবে সমাজের তথা রাষ্ট্রের ক্ষতিসাধন করা। অন্যায়কারীকে বাধা না দিয়ে ক্রমশ তাকে বাড়তে দেওয়ার ফলে পরোক্ষভাবে প্রশ্রয়দানকারী ব্যক্তি সমাজের ক্ষতি সাধন করে। অন্যায় আচরণটি যদি নির্দিষ্ট কোন ব্যক্তির বিরুদ্ধে সংঘটিত হয়, তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ইচ্ছে করলে তা ক্ষমা করতে পারে। তবে এক্ষেত্রে একটি সীমা থাকা প্রয়োজন। অন্যায় করে যদি কেউ অনবরত ক্ষমা পেতে থাকে, তবে দিন দিন তার অপরাধ প্রবণতা প্রবল হয়ে উঠে এবং বাধা না পাবার দরুণ সে সমাজ ও দেশের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়।

তাই এ শ্রেণির লোকও সমান অপরাধে অপরাধী। কারণ তারা যদি অন্যায় সহ্য না করে প্রতিবাদ করত, বাধা দিত, তাহলে সমাজে কেউ আর অন্যায় করতে সাহসি হতো না। সমাজ হতো সুখ-সমৃদ্ধিতে ভরপুর। সুতরাং অন্যায়কারীকে কোন সময়ই প্রশ্রয় দেয়া ঠিক নয়। কেননা, অন্যায়কারী ও অন্যায় সহ্যকারী উভয়েই বিধাতার নিকট অপরাধী।

 

 

অন্যায় যে করে অর অন্যায় যে সহে || ভাব-সম্প্রসারণ Read More

জাতীয় জীবনে সন্তোষ এবং আকাক্সক্ষা দুইয়ের মাত্রা বাড়িয়া গেলে বিনাশের কারণ ঘটে। ভাব-সম্প্রারণ

জাতীয় জীবনে সন্তোষ এবং আকাঙ্ক্ষা দুইয়ের মাত্রা বাড়িয়া গেলে বিনাশের কারণ ঘটে

আকাক্সক্ষা মানুষকে সামনে টেনে নেয়। আকক্সক্ষা না থাকলে প্রাপ্তির আনন্দের সুযোগ থাকে না। সন্তুষ্টি লাভের জন্য আকাক্সক্ষা থাকতে হয়। মূলত আকাক্সক্ষাই ব্যক্তিগত জাতীয় ও জীবনের উন্নতির মূল। আকাক্সক্ষা শেষ হয়ে গেলে জীবনের গতি থেমে যায়। আবার আকাক্সক্ষার মাত্রা যদি খুব বেশি হয়, তাহলে লক্ষে পৌঁছানো অসম্ভব হয়ে পড়ে।

জাতীয় জীবনে সšেতাষ এবং আকাক্সক্ষাÑএ দু’য়ের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। ব্যক্তিগত জীবনে মানুষ উচ্চাশা করে। কখনও আংশিক কখনও সম্পূর্ণ আবার কখনও একটুও পূরণ হয়না। তবুও মানুষ আশার আকাক্সক্ষা বুকে লালন করে। আশাই মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে। আশা না থাকলে জীবনের কোন অর্থ থাকে না। সেজন্য সহজে সন্তুষ্টি লাভ করা উন্নতির অন্তরায় বলে বিবেচিত হয়ে থাকে। যেমনÑ শিক্ষার্থীরা সবাই যদি এ+ প্রত্যাশা লালন করে, তাহলে নিদেনপক্ষে সে এ গ্রেড তো পাবে। কিন্তু কোন শিক্ষার্থীর মধ্যে যদি এ+ এর আকাক্সক্ষাই না থাকে তাহলে তার পক্ষে এ-(এ মাইনাস) পাওয়াও প্রায় সম্ভব নয়।

অনুরূপভাবে, জাতীয় জীবনেও উন্নতির জন্য আকাক্সক্ষা থাকা জরুরি। যে জাতি সুনির্দিষ্ট লক্ষ অর্জনের প্রত্যাশায় চেষ্টা চালাবে, সে জাতি উন্নতি অর্জন করবেই। উন্নত বিশ্বের উন্নতির মূলে লক্ষ করা যায় তাদের তীব্র আকাক্সক্ষা। চীন, মালয়েশিয়া, দুবাই এগিয়ে যাবার মূলে তাদের জাতীয় জীবনের আকাক্সক্ষা। অন্যদিকে অন্নুতদেশগুলির পিছিয়ে পড়ার মূলে তাদের প্রবল আকাক্সক্ষার অভাব।

তবে একথাও সত্যি, ব্যক্তিগত ও জাতীয় জীবনে আকাক্সক্ষা পরিতৃপ্তির মাত্রা থাকা জরুরি। বাস্তবতার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ না থাকলে আকাক্সক্ষা পূরণ হবার নয়। আবার অবাস্তব প্রত্যশা উভয় ক্ষেত্রেই হতাশা বাড়ায়। তাই ব্যক্তিগত ও জাতীয় জীবনে আকাক্সক্ষা পূরণ হবার সাথে যৌক্তিক বাস্তবতা থাকা প্রয়োজন।

আবার, যেখানে সন্তুষ্টি সেখানেই স্থবিরতা। অল্পতেই সন্তুষ্ট থাকা ভালো। কিন্তু সন্তুষ্টির মাত্রা থাকা প্রয়োজন। কারণ অতিমাত্রার সন্তুষ্টি ও পরিতৃপ্তিবোধ অলস ও নিস্ক্রিয় করে তোলে। সেক্ষেত্রে কাঙ্খিত সাফল্য অর্জন ব্যর্থ হয়। তাই, আমাদের মনে রাখতে হবে অবাস্তব কোন কিছুই সুফল বয়ে আনে না।

জাতীয় জীবনে সন্তোষ এবং আকাক্সক্ষা দুইয়ের মাত্রা বাড়িয়া গেলে বিনাশের কারণ ঘটে। ভাব-সম্প্রারণ Read More

ফ্যাশনটা মুখোশ, স্টাইলটা হল মুখশ্রী । ভাব-সম্প্রসারণ

ফ্যাশনটা মুখোশ, স্টাইলটা হল মুখশ্রী

ভাব-সম্প্রসারণ: অপসংস্কৃতি অনুসরণ ও লালন করাই হলো মুখোশ। আর স্বকীয়তাই হলো স্টাইল; সৌন্দর্য; অর্থাৎ-মুখশ্রী। মানুষের নিজস্ব বৈশিষ্ট্যই প্রকৃত বৈশিষ্ট্য। প্রকৃত সত্তার সৌন্দর্যও সেখানেই। মানুষের স্বকীয়তা নিজস্ব দাবিতে ভাস্বর থাকবে-এটাই স্বভাবিক।

মানবজাতি খুব বেশি অনুকরণপ্রিয়। নিজেদের স্বকীয়তা ভুলে গিয়ে অন্যকে অনুকরণ করতে পছন্দ করে। রবীন্দ্র যুগে অনেক কবি-সাহিত্যিকগণও স্বকীয়তা ভুলে গিয়ে রবীন্দ্র বলয়ে ঢুকে পড়েন। আবার যুগের তালেই মানুষ নিজ সংস্কৃতি ভুলে আগ্রাসী সংস্কৃতি গ্রহণ করে। আমরা নিজেদের তথাকথিত আধুনিক হবার নামে তাদের অনেক কিছু অনুকরণ করি। কিন্তু এ অনুকরণের ফলে আমাদের কোনো নিজস্বতা থাকে না। বরং আমাদের মাঝে এগুলোর প্রভাবে গড়ে ওঠে একটা ঠুন্কো আধুনিকতা। যে আধুনিকতার অভাব থাকে নিজস্ব বৈশিষ্ট্যের।

নিজস্ব ঐতিহ্য-সংস্কৃতিতে অগ্রসর হলে তাতে কোনো মিথ্যে আবরণ থাকে না। থাকে না কোনো জড়তা। থাকে না অপসংস্কৃতির আগ্রাসনে সমাজ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার সম্ভাবনা। অন্যের যা কিছু ভাল, তা গ্রহণ করা খারাপ নয়। তবে অবশ্যই সেগুলো আমাদের সমাজ, সাহিত্য ও সংস্কৃতির সাথে মানানসই হতে হবে । নিজস্ব সংস্কৃতির পরিসরে বিচরণ করলে কোনো কু প্রভাব আমাদের উপর মুখোশের মতো চেপে বসতে পারে না। অন্যের সবকিছু নিয়ে যদি আমরা মুখোশ পরিধান করি, তাহলে আমরা আমাদের নিজস্বতাকে আড়াল করলাম। আমাদের স্বকীয়তাকে নিজ হাতে ধ¦ংস করলাম। নিজস্ব সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য আমাদের মুখশ্রীকে আরো উজ্জল করে তোলে ।

সর্বোপরি, আমরা না হতে পারছি বিদেশি না হতে পারছি স্বদেশি। একটি মিশ্র আবরণ আমাদের ঘিরে রেখেছে।

ফ্যাশনটা মুখোশ, স্টাইলটা হল মুখশ্রী । ভাব-সম্প্রসারণ Read More