মীর মশাররফ হোসেন

মীর মশাররফ হোসেন

বাংলা সাহিত্যের প্রথম বাঙালি মুসলিম নাট্যকার এবং প্রথম মুসলিম উপন্যাস রচয়িতা মীর মশাররফ হোসেন আধুনিক বাঙালি মুসলমান সাহিত্যিকদের পথিকৃৎ । সামগ্রিকভাবে তিনি উনিশ শতকের অন্যতম শ্রেষ্ঠ লেখক । ১৮৬৯ খ্রিস্টাব্দে তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘রত্নাবতী’ প্রকাশিত হয়। বিষয়বস্তু ও আঙ্গিক বিচারে তাঁর সাহিত্যকর্ম বিপুল ও বৈচিত্র্যময়। উপন্যাস, নাটক, প্রহসন, কবিতা, আত্মজীবনী, জীবনচরিত, ধর্ম-সাহিত্য সব রকম বিষয়েই লিখেছেন তিনি । তবে ‘বিষাদ সিন্ধু’ তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত ও জনপ্রিয় উপন্যাস । প্রথম প্রকাশের শতবর্ষ পরে, এখনও এটি পাঠক সমাদৃত। তিনি ১৯ ডিসেম্বর, ১৯১১ সালে পরলোকগমন করেন।

উদাসীন পথিকের মনের কথা কার রচনা ? এটি কোন ধরনের সৃষ্টিকর্ম ?

উদাসীন পথিকের মনের কথা রচনা করেছেন মীর মশাররফ হোসেন । এটি লেখকের আত্মজীবনীমূলক ও প্রত্যক্ষ নির্ভর উপাখ্যান । ১৮৯০ সালে প্রকাশিত এই গ্রন্থে নীলকরদের অত্যাচারের ভয়াবহ চিত্র এবং পরিণতি তুলে ধরা হয়েছে । এতে আছে দুঃখী জীবনের প্রতি অকৃত্রিম সহানুভূতি । হিন্দু – মুসলমানের সঙ্গবদ্ধ সংগ্রামের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ । এ রচনায় লেখকের সৃষ্টিশীল শিল্পচেনার মহত্তর পরিচয় পাওয়া যায় ।

বিষাদসিন্ধু  গ্রন্থের জনপ্রিতার কারণ কী?

মীর মশাররফ হোসেন রচিত বিষাদসিন্ধু বাংলা সাহিত্যের একমাত্র গদ্য মহাকাব্য । এটি মূলত ইতিহাস আশ্রিত রচনা । মহানবী (সা.) এর দৌহিত্র ইমাম হোসেনের সঙ্গে দামেস্ক অধিপতি এজিদের যুদ্ধে ইমাম হোসেনের বেদনাদায়ক মৃত্যুই এই রচনার উপজীব্য। ইসলাম ধর্ম সংশ্লিষ্ট স্পর্শকাতর বিষয় হওয়ায় এটি মুসলমানদের কাছে জনপ্রিয় হয়েছে । এছাড়া চিত্তাকর্ষক রচনাগুণ গ্রন্থটি জনপ্রিয় হওয়ার অন্যতম কারণ ।

মীর মশাররফ হোসেন রচিত তিনটি নাটক ও তিনটি পরিচয় ।

মীর মশাররফ হোসেন বাংলা গদ্যসাহিত্যে মুসলিম লেখক হিসেবে সবিশেষ গুরুত্বের অধিকারী। সাহিত্যের অপরাপর ক্ষেত্রে তাঁর কৃতিত্বের সঙ্গে বাংলা নাটক রচনায়ও তাঁর প্রতিভা সমধিক বিকশিত হয়েছে । মীর মশাররফ হোসেন রচিত নাটক ও প্রহসনগুলো তৎকালীন সমাজ ও সংস্কৃতির অনন্য দলিল । নিম্নে তাঁর তিনটি নাটক ও তিনটি প্রহসনের নাম দেওয়া হলো :
নাটক : ১. বসন্তকুমারী, ২. জমিদার দর্পণ ও ৩. বেহুলা গীতাভিনয় ।
প্রহসন : ১. এর উপায় কি , ২. ভাই ভাই এইতো চাই ও ৩. ফাঁস কাগজ ।

মীর মশাররফ হোসেন রচিত তিনটি কাব্য ও তিনটি উপন্যাসের পরিচয় দাও ।

মীর মশাররফ হোসেন বাংলা সাহিত্যের আধুনিক যুগে প্রথম উল্লেখযোগ্য মুসলিম সাহিত্যিক । তাঁর বহুমুখী প্রতিভার বলে মুসলিম রচিত বাংলা সাহিত্য বিশেষভাবে সমৃদ্ধ হয়েছে । তিনি উপন্যাস, প্রহসন, কাব্য ও প্রবন্ধ প্রভৃতি সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় কৃতিত্ব দেখিয়েছেন । নিম্নে তাঁর তিনটি উপন্যাস ও তিনটি কাব্যের নাম দেওয়া হলো : উপন্যাস : ১. রত্নাবতী , ২. বিষাদসিন্ধু ও ৩. উদাসীন পথিকের মনের কথা । কাব্য : ১. গোরাই ব্রীজ , ২. প্রেম পারিজাত ও ৩. মৌলুদ শরীফ ।

বিষাদ সিন্ধু  উপন্যাসের নামের তাৎপর্য  সংক্ষেপে আলোচনা ।

বিষাদ সিন্ধু মীর মশাররফ হোসেনের অমর সৃষ্টি। কারবালার ঐতিহাসিক কাহিনী অবলম্বনে রচিত এ উপন্যাসের বিষয়বস্তু মর্মান্তিক ও বিষাদময় । ঔপন্যাসিক কারবালার এ বিষাদময় করুণ কাহিনীকে আরও বিষাদময় করে ফুটিয়ে তুলেছেন । উপাখ্যানের মূল বিষয় হিসেবে ইতিহাসের পাশাপাশি সুগভীর জীবনবোধ চিত্রিত হয়েছে । নিয়তির নির্মমভায় মানবভাগ্যের উপর নেমে এসেছে করুণ পরিণতি । এ করুণ পরিণতি পাঠকের চিত্তকে আবেগে আপ্লুত করে । পাঠক কাহিনীর যত গভীরে যায় ততই মন বিষাদময়তায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে । ঔপন্যাসিক ভয়াবহ এ পরিণতির রূপকে সিন্ধুর সাথে তুলনা করে এ নামকরণ করেছেন ।
এজিদ কে ?
মীর মশাররফ হোসেনের উপন্যাস তথা বাংলা সাহিত্যের একমাত্র গদ্য মহাকাব্য বিষাদ সিন্ধুতে এজিদের পরিচয় পাওয়া যায় । এজিদ ছিল দামেস্ক অধিপতি মুয়াবিয়ার একমাত্র পুত্র । হযরত মুহাম্মদ ( সাঃ ) -এর দৌহিত্র ইমাম হোসেনের সাথে কারবালা প্রান্তরে এজিদের সেনাদের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ হয় ।

আত্মজৈবনিক উপন্যাস কাকে বলে ? একটি আত্মজৈবনিক উপন্যাসের বিষয়বস্তু লিখুন ।

রচয়িতার নিজের কাহিনী যখন উপন্যাসের চরিত্রের মধ্য দিয়ে প্রকাশিত হয় এবং কাহিনী এগিয়ে চলে তাকে আত্মজৈবনিক উপন্যাস বলে । মীর মশাররফ হোসেনের ‘উদাসীন পথিকের মনের কথা’ বাংলা সাহিত্যের বিখ্যাত আত্মজৈবনিক উপন্যাস । ‘উদাসীন পথিকের মনের কথা’ ( ১৮৯০ ) গ্রন্থে নীলকর অত্যাচারের কাহিনী রূপায়ণের সঙ্গে উপন্যাসের বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান । আত্মজীবনীমূলক এ গ্রন্থে সে আমলের নীলকরদের ভয়াবহ অত্যাচারের চিত্র এবং তার পরিণতি প্রতিফলিত হয়েছে । গ্রন্থে মীর মশাররফ হোসেন ‘উদাসীন পথিক’ ছদ্মনাম অবলম্বন করেছিলেন । সামাজিক শ্রেণি সংঘাতের চিত্র এখানে স্পষ্ট । নীলকরদের অত্যাচারের চিত্র বর্ণনায় লেখকের যথেষ্ট সার্থকতা ফুটে উঠলেও গল্পরস মাধুর্যমণ্ডিত হয়নি ।

বসন্তকুমারী’ নাটকের বিষয়বস্তু কী ?

মীর মশারফ হোসেনের নাটকগুলোর মধ্যে ‘বসন্তকুমারী নাটক’ (১৮৭৩) বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য । মুসলমান নাট্যকার রচিত প্রথম হিসেবে এর গুরুত্ব বিদ্যমান । ইন্দ্রপুরে বিপত্নীক রাজার বৃদ্ধ বয়সে যুবতী-স্ত্রী গ্রহণ, রাজার যুবক পুত্রের প্রতি বিমাতার আকর্ষণ এবং প্রেমনিবেদন, পুত্রের প্রত্যাখ্যান এবং বিমাতার ষড়যন্ত্র, পরিশেষে রাজপরিবারের সকলের মৃত্যু-এ কাহিনী অবলম্বনে ‘বসন্তকুমারী নাটক’ রচিত ।

গাজী মিয়ার বস্তানী ‘ গ্রন্থের পরিচয় দিন ।

গাজী মিয়ার বস্তানী’ মীর মশাররফ হোসেনের আত্মজীবনীমূলক রসরচনা জাতীয় গ্রন্থ। গাজী মিয়া লেখকের ছদ্মনাম। চব্বিশ নথি বা পরিচ্ছেদ সম্বলিত দুই খণ্ডে সমাপ্ত এই গ্রন্থে গাজী মিয়ার আত্মপরিচয়, বস্তানীপ্রাপ্তির বিবরণ, অপর হস্তে অর্পনের কারণ, ফলশ্রুতি, পরিমাণ এবং সবশেষে গাজী মিঞার বিদায় – প্রভৃতি বিবরণের পরিপ্রেক্ষিতে তৎকালীন কলুষিত সমাজের চিত্র অঙ্কিত হয়েছে । এই গ্রন্থটিকে পরিবেশের প্রতি বীতশ্রদ্ধ ও রুগ্ন মীরমানসের এক প্রতিশোধাত্মক ‘দপ্তর’ বলে অভিহিত করা যায় ।

গদ্য মহাকাব্য কাকে বলে ? একটি গদ্য মহাকব্যের পরিচয় দিন ।

যে উপন্যাসধর্মী রচনা গদ্যে বিকাশ লাভ করে অথচ তার বাক্যগুলোতে এক ধরণের কাব্যিক ছন্দ পরিলক্ষিত হয় – এ ধরনের উপন্যাস কে গদ্য মহাকাব্য বলে । বাংলা সাহিত্যের একমাত্র গদ্য মহাকাব্য মীর মশাররফ হোসেনের ‘বিষাদ সিন্ধু’ । বিষাদসিন্ধু মূলত ইতিহাস আশ্রিত রচনা । মহানবী (সা.) এর দৌহিত্র ইমাম হোসেনের সঙ্গে দামেস্ক অধিপতি এজিদের যুদ্ধে ইমাম হোসেনের বেদনাদায়ক মৃত্যুই এই রচনার উপজীব্য । ইসলাম ধর্ম সংশ্লিষ্ট স্পর্শকাতর বিষয় হওয়ায় এটি মুসলমানদের কাছে জনপ্রিয় হয়েছে।
মীর মশাররফ হোসেন Read More

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

বঙ্কিমচন্দ্র ২৬ জুন, ১৮৩৮ সালে পশ্চিম বঙ্গের চব্বিশ পরগনার কাঁঠালপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন । বঙ্কিমচন্দ্রের উপাধি ‘ সাহিত্য সম্রাট ‘ । এছাড়াও তাকে ‘ বাংলা উপন্যাসের জনক বলা হয় । তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বপ্রথম Graduate এবং পেশায় ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন । ‘ বঙ্গদর্শন নামে যে বিখ্যাত সাহিত্য পত্রিকার তিনি প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ছিলেন , বাংলা সাহিত্যের বিকাশে এবং শক্তিশালী লেখক সৃষ্টিতে তার অবদান অসামান্য । তিনি ৮ এপ্রিল , ১৮৯৪ সালে মৃত্যুবরণ করেন ।

বঙ্কিমচন্দ্রের সব উপন্যাসই রোমান্সমূলক’

বাংলা সাহিত্যের প্রথম সার্থক ঔপন্যাসিক বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (১৮৩৮-৯৪)। বাংলা সাহিত্যে তিনি রোমান্সমূলক উপন্যাসের স্রষ্টা । তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘দুর্গেশনন্দিনী’তে রোমান্সমূলক ধারার সূত্রপাত হয়েছে । চিন্তা-চেতনায় ইউরোপীয় আদর্শের অনুসারী বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর সাহিত্যে কল্পনা জগতের অবাধ বিচরণ ঘটিয়েছেন । তাঁর রচিত ‘কপালকুণ্ডলা’ বাংলা সাহিত্যের অসাধারণ রোমান্টিক উপন্যাস। এ রোমান্সের ধারা শেষ পর্যন্ত বিষবৃদ্ধ, কৃষ্ণকান্তের উইল, রজনী, মৃণালিনী, ইন্দিরা প্রভৃতি উপন্যাসেও অব্যাহত ছিল। এসব উপন্যাসে বাঙালির অতীত ইতিহাস যেমন স্থান পেয়েছে, তেমনি ব্যক্ত হয়েছে সমকালীন সমাজজীবনের কথা। উপন্যাসের আখ্যান বাস্তব জীবনকে ভিত্তিভূমি হিসেবে গ্রহণ করলেও বিস্ময়কর ও অলৌকিকের প্রতি তীব্র আকর্ষণ আছে । রোমান্স রচনায় ইতিহাস ও দৈবশক্তির সংমিশ্রণ ঘটিয়ে তার সাথে সংযুক্ত করেছেন রহস্যময় দৃঢ় ব্যক্তিত্বশালী মনুষ্যচরিত্র । ফলে তাঁর সব উপন্যাসেই নিগূঢ় ভাবসঙ্গতির রোমান্স ফুটে উঠেছে ।
বঙ্কিমচন্দ্রের ইতিহাস ও রোমান্সধর্মী উপন্যাস : দুর্গেশনন্দিনী, কপালকুঝলা, মৃণালিনী, চন্দ্রশেখর, রাজসিংহ, সীতারাম প্রভৃতি পরিমচন্দ্রের ইতিহাস ও রোমান্সধর্মী উপন্যাস |

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে বাংলা উপন্যাসের জনক বলা হয় কেন ?

উপন্যাসের প্রাথমিক প্রচেষ্টার বিচিত্র পরীক্ষা-নিরীক্ষার কালাতিক্রমের পর বাংলা সাহিত্যে প্রথম সার্থক উপন্যাস রচনার কৃতিত্ব বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের প্রাপ্য । বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর সাহিত্যিক জীবনে চৌদ্দটি উপন্যাস রচনা করেছেন । এসব উপন্যাসে বাঙালির অতীত ইতিহাস যেমন স্থান পেয়েছে , তেমনি ব্যক্ত হয়েছে সমকালীন সমাজজীবনের কথা । তাঁর উপন্যাসে বাস্তব জীবনকে ভিত্তিভূমি হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে এবং সেখানে অলৌকিকের প্রতি তীব্র আকর্ষণ বিদ্যমান রয়েছে । তাঁর উপন্যাসে রোমান্সের বৈশিষ্ট্য নিহিত আছে । রোমান্স রচনায় ইতিহাস , দৈবশক্তির সংমিশ্রণ ঘটিয়ে তার সাথে যুদ্ধ করেছেন রহস্যময় দৃঢ় ব্যক্তিত্বশালী মনুষ্যচরিত্র । (বঙ্কিম পূর্ববর্তী যুগে উপন্যাসের এত বহুমাত্রিক বিকাশ খুব বেশি লক্ষ করা যায় না । উপন্যাসের অবয়ব সমৃদ্ধ কিছু কিছু পুস্তক রচিত হয়েছে তবে উপন্যাসের সমস্ত লক্ষণ কেবল বঙ্কিমচন্দ্র রচিত উপন্যাসগুলোতেই প্রথম পাওয়া গেছে । এজন্যই তাঁকে বাংলা সাহিত্যের প্রথম সার্থক ঔপন্যাসিক বলা হয়ে থাকে ।

বঙ্কিমচন্দ্রের ব্যঙ্গরসাত্মক রচনাগুলো বাংলা সাহিত্যের গৌরবসর সংযোজন।

বভিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ( ১৮৩৮-১৮৯৪ ) বাংলা প্রবন্ধ সাহিত্যের ধারায় বিরাট প্রতিভা নিয়ে আবির্ভূত হন । তিনি বাংলা সমালোচনা সাহিত্যের অভূতপূর্ব সমৃদ্ধি সাধন করেন । তাঁর সমস্ত প্রবন্ধের বক্তবা পরিবেশনের গুণে সুস্পষ্ট ও মননদীও হয়ে উঠেছে । বঙ্কিমচন্দ্র তিন ধরনের প্রবন্ধগ্রন্থ রচনা করেছিলেন । যেমন-
১. ব্যঙ্গাত্মক ও সরস
২. জ্ঞান – বিজ্ঞান ও সমালোচনা বিষয়ক
৩. দর্শন ও শাচর্চাবিষয়ক ।
বঙ্কিমচন্দ্রের ব্যঙ্গরসাত্মক রচনাগুলো বাংলা সাহিত্যের গৌরবময় সংযোজন । এই প্রবন্ধগুলোতে বঙ্কিমচন্দ্র সমকালীন সমাজ , শিক্ষাদীক্ষা ও চারিত্রিক অসঙ্গতি কৌতুক রসের মধ্য দিয়ে চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন । এতে গুরুতর জত্ত্বকথাও সরল ও হৃদয়গ্রাহী হয়ে পড়েছে । ব্যাঘ্রাচার্য্য বৃহল্লাঙ্গুল, ইংরাজস্তোত্র, বাবু, গর্দভ, দাম্পত্য দণ্ডবিধির আইন প্রভৃতি ব্যঙ্গরসাত্মক রচনার উৎকৃষ্ট উদাহরণ । তবে ‘কমলাকান্তের দপ্তর’ (১৮৭৫) বঙ্কিমচন্দ্রের বিশিষ্ট ব্যঙ্গরসাত্মক রচনা। এ প্রবন্ধে তিনি আফিমখোর বৃদ্ধ ব্রাহ্মণের উক্তির মাধ্যমে পারিপার্শ্বিকতার ব্যঙ্গাত্মক চিত্র এঁকেছেন । তাঁর হাতে ব্যঙ্গবিদ্রূপ পেয়েছে এক ভিন্নমাত্রা।  বাংলা প্রবন্ধ সাহিত্যে তাঁর রচিত ব্যঙ্গরসাত্মক প্রবন্ধগুলো বিশিষ্ট স্থান অধিকার করেছে একথা নিঃসন্দেহে বলা যায় ।

বাংলা সাহিত্যের প্রথম সার্থক ঔপন্যাসিক হিসেবে বঙ্কিমচন্দ্রের কৃতিত্ব।

উপন্যাসের প্রাথমিক প্রচেষ্টার বিচিত্র পরীক্ষা-নিরীক্ষার কালাতিক্রমের পর বাংলা সাহিত্যে প্রথম সার্থক উপন্যাস রচনার কৃতিত্ব বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের প্রাপ্য। বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর সাহিত্যিক জীবনে চৌদ্দটি উপন্যাস রচনা করেছেন। এসব উপন্যাসে বাঙালির অতীত ইতিহাস যেমন স্থান পেয়েছে, তেমনি ব্যক্ত হয়েছে সমকালীন সমাজজীবনের কথা। তাঁর উপন্যাসে বাস্তব জীবনকে ভিত্তিভূমি হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে এবং সেখানে অলৌকিকের প্রতি তীব্র আকর্ষণ বিদ্যমান রয়েছে । তাঁর উপন্যাসে রোমান্সের বৈশিষ্ট্য নিহিত আছে । রোমান্স রচনায় ইতিহাস, দৈবশক্তির সংমিশ্রণ ঘটিয়ে তার সাথে যুদ্ধ করেছেন রহস্যময় দৃঢ় ব্যক্তিত্বশালী মনুষ্যচরিত্র । বঙ্কিম পূর্ববর্তী যুগে উপন্যাসের এত বহুমাত্রিক বিকাশ খুব বেশি লক্ষ করা যায় না । উপন্যাসের অবয়ব সমৃদ্ধ কিছু কিছু পুস্তক রচিত হয়েছে তবে উপন্যাসের সমস্ত লক্ষণ কেবল বঙ্কিমচন্দ্র রচিত উপন্যাসগুলোতেই প্রথম পাওয়া গেছে । এজন্যই তাঁকে বাংলা সাহিত্যের প্রথম সার্থক ঔপন্যাসিক বলা হয়ে থাকে ।

কপালকুগুলা চরিত্রের স্বরূপ নির্ণয়

কপালকুণ্ডলা বঙ্কিমচন্দ্র রচিত বাংলা সাহিত্যের প্রথম রোমান্টিক উপন্যাস । কপালকুণ্ডলা উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র। কপালকুগুলা অরণ্যে কাপালিকের কাছে প্রতিপালিত হয়েছে। সে সমাজের সংস্কার জানে না। নবকুমারের সঙ্গে তার প্রণয় ও পরিণয় এবং পরবর্তীতে সমাজ বন্ধনের সাথে জন্মই তার চরিত্রটিকে ফুটিয়ে তুলেছে । তার চরিত্র রহস্যময় । সে নবকুমারকে ভালবাসে , কাপালিক পরে তার শত্রু হয়ে যায়, কাপালিকের হাত থেকে নবকুমারকে বাঁচালেও মৃত্যুর মধ্য দিয়ে তার চরিত্রের রহস্যময়তাই পরিলক্ষিত হয় ।
কপালকুণ্ডলা’ উপন্যাসে দুটি ত্রিভুজ প্রেমের আভাস আছে-
১. মতিবিধি > নবকুমার > কপালকুগুলা
২. মতিবিধি > সেলিম > মেহেরুন্নেসা “
*কাপালিকের গৃহ হতে খাদ্যান্বেষণে বের হয়ে নরকুমার সমুদ্রপাড়ে গিয়ে বসলে কপালকুণ্ডলা নবকুমারকে ‘পথিক, তুমি পথ হারাইয়াছ ?  কথা বলেছিল ।

বাঙলা গদ্যে বঙ্কিমচন্দ্রের অবদান

১. বিদ্যাসাগরীয় ও আলালী রীতির সমন্বয় সাধন করে তাতে তিনি প্রাণ প্রতিষ্ঠা করেন এবং নিজের বৈশিষ্ট্যের ছাপ বসিয়ে দেন ।
২. বিচিত্র রচনাবলীর সাহায্যে বঙ্কিমচন্দ্র বাংলা ভাষাকে যথার্থ উৎকর্ষমণ্ডিত করেন ।
৩. গদ্য রচনার যে বিশেষ স্টাইল বা রীতি রয়েছে সেটা তিনিই প্রথম পরিপূর্ণভাবে তুলে ধরেন ।
৪. তাঁর সাহিত্য রচনায় ভাষা ভাবের বাহন থেকে রসের বাহনে উন্নতি হয়; বাঙালি পাঠক গদা সাহিত্য থেকে রসের তৃষ্ণা মেটাতে সক্ষম হয় ।
৫. প্রবন্ধ রচনায় তাঁর ভাষ্য মনীষার বাহন হয়ে ওঠে । ব্যঙ্গাত্মক ও সরল রচনা , জ্ঞান – বিজ্ঞান ও শাস্ত্র আলোচনা এবং মননশীল প্রবন্ধ ও বিশ্লেষণধর্মী আলোচনা সব বিষয়ের উপযোগী হয়ে ওঠে বাংলা গদ্য ।
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় Read More