স্বদেশের উপকারে নাই যার মন কে বলে মানুষ তারে? পশু সেই জন। ভাব-সম্প্রাসারণ

স্বদেশের উপকারে নাই যার মন
কে বলে মানুষ তারে? পশু সেই জন।

ভাব-সম্প্রাসারণ : স্বদেশপ্রেমের মধ্য দিয়েই মানুষের মহত্ত্বের মহিমা ফুটে উঠে। স্বদেশের উপকারে যে মানুষ এগিয়ে আসে না সে বিবেকবর্জিত অমানুষ, সে পশুর সমতুল্য।

পৃথিবীর প্রতিটি মানুষই তার জন্মভূমিকে প্রাণের চেয়ে ভালবাসে। দেশ ও জাতির সেবায় নিজেকে উৎসর্গ করে। এর মধ্যেই মানব জীবনের সার্থকতা। একজন মানুষ যতই ধনবান, রূপবান, জ্ঞানবান, ক্ষমাতাধর হোক না কেন তার যদি দেশপ্রেম না থাকে, তাহলে তার অর্থ-যশ খ্যাতি সবই বৃথা। মানুষ হিসাবে জন্মগ্রহণ করলেই একজন মানুষ প্রকৃত মানুষ হয় না। তার ভেতরে যদি মানবীয় গুণাবলি না থাকে তবে সে নামেই মানুষ, প্রকৃত মানুষ নয়। তখন তাকে একটি পশুর সাথে তুলনা করা যায়। কেননা, পশুও জন্মগ্রহণ করে, খাদ্য খায়, জন্ম দেয় এবং পরিশেষে মারা যায়। পশু ও মানুষের মধ্যে পার্থক্য এই যে, পশুর মধ্যে কোন মহৎ গুণাবলি নাই, কিন্তু মানুষের মধ্যে আছে। যার মধ্যে মনুষত্বের গণুাবলি আছে সে-ই প্রকৃত মানুষ। মহৎ গুণ হচ্ছে দেশপ্রেম বা স্বদেশের উপকার করার ইচ্ছা। যারা নিঃস্বার্থভাবে দেশকে ভালবাসে এবং দেশ ও জাতির কল্যাণে নিজেকে উৎসর্গ করে প্রকৃতপক্ষে তারাই মানুষ। দেশপ্রেমিক তারাই। তারা যুগে যুগে, চিরকালের জন্য জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলের কাছে চিরস্মণীয় হয়ে থাকে। পক্ষান্তরে, যারা দেশকে ভালবাসে না, নিজেদের স্বার্থোদ্ধারের জন্য দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, সম্মান ও গৌরবকে পদদলিত করে; দেশের সম্পদ শত্রুদের নিকট পাচার করে দেশ দেশদ্রোহী বিভিন্ন কাজে লিপ্ত হয় তারা মানুষ নয়, তারা পশুর চেয়েও অধম।

তাই, দেশপ্রেমহীন মানুষ পশুর মতোই। দেশের কল্যাণের চেয়ে আত্মস্বার্থকে বড় করে দেখে। অন্যদিকে, যাদের মধ্যে দেশপ্রেম আছে তারা দেশের কল্যাণে আত্মোৎসর্গ করে ধন্য হয়।

স্বদেশের উপকারে নাই যার মন কে বলে মানুষ তারে? পশু সেই জন। ভাব-সম্প্রাসারণ Read More

অন্যায় যে করে অর অন্যায় যে সহে || ভাব-সম্প্রসারণ

অন্যায় যে করে অর অন্যায় যে সহে / তব ঘৃণা তারে যেন তৃণসম দহে।

ভাব-সম্প্রাসরণ: অন্যায়কারী যেমন অপরাধী বলে বিবেচিত হয়, তেমনি অন্যায়কারীর ভয়ে প্রতিবাদ না করে যারা নীরবে অন্যায় সহ্য করে, তারাও অন্যাকারীর মতো সমান অপরাধে অপরাধী।

মানুষকে একটি রাষ্ট্রিয় কাঠামোর মধ্যে সমাজবদ্ধ হয়ে বসবাস করতে হয়। রাষ্ট্র মানুষের জন্য কিছু আইন প্রণয়ন করে। এসব আইন-কানুন, প্রথা মানুষকে মান্য করে চলতে হয়। এগুলোর কোন একটি লঙ্ঘন করাই হচ্ছে অন্যায় বা অপরাধ। অন্যভাবে বলা যায়, স্বাভাবিক বিবেক-বুদ্ধির পরিপন্থি কিংবা ন্যায়ের পরিপন্থি কোন কাজ করাই হলো অন্যায়। কেউ অন্যায় কাজ করবে এটি কোন সুস্থ মানুষের বা সমাজের কাম্য হতে পারে না। তাই অন্যায়কারীকে সবাই ঘৃণার চোখে দেখে। বিধাতার নিকটও একজন অন্যায়কারী সর্বদাই ঘৃণ্য এবং তার জন্য কঠিন শাস্তির ব্যবস্থা থাকে।

কিন্তু অন্যায়কারীকে যারা প্রশ্রয় দেয় তারাও কোনো অংশে কম অপরাধী নয়। ক্ষমা একটি মহৎ গুণ এ বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। কারো অপরাধ বা অন্যায় আচরণ ক্ষমা করার মধ্যে নিঃসন্দেহে বড় ধরনের কৃতিত্ব নিহিত আছে। তবে যে অপরাধ সমাজের বিরুদ্ধে সংঘটিত হয়, অথবা একটি জনগোষ্টির বিরুদ্ধে করা হয় অথবা এর দ্বারা একাধিক মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়; সেক্ষেত্রে একজন ব্যক্তির তা ক্ষমা করার কোন অধিকার নেই। এক্ষেত্রে অন্যায়কারীকে প্রশ্রয় দেওয়ার অর্থ হবে সমাজের তথা রাষ্ট্রের ক্ষতিসাধন করা। অন্যায়কারীকে বাধা না দিয়ে ক্রমশ তাকে বাড়তে দেওয়ার ফলে পরোক্ষভাবে প্রশ্রয়দানকারী ব্যক্তি সমাজের ক্ষতি সাধন করে। অন্যায় আচরণটি যদি নির্দিষ্ট কোন ব্যক্তির বিরুদ্ধে সংঘটিত হয়, তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ইচ্ছে করলে তা ক্ষমা করতে পারে। তবে এক্ষেত্রে একটি সীমা থাকা প্রয়োজন। অন্যায় করে যদি কেউ অনবরত ক্ষমা পেতে থাকে, তবে দিন দিন তার অপরাধ প্রবণতা প্রবল হয়ে উঠে এবং বাধা না পাবার দরুণ সে সমাজ ও দেশের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়।

তাই এ শ্রেণির লোকও সমান অপরাধে অপরাধী। কারণ তারা যদি অন্যায় সহ্য না করে প্রতিবাদ করত, বাধা দিত, তাহলে সমাজে কেউ আর অন্যায় করতে সাহসি হতো না। সমাজ হতো সুখ-সমৃদ্ধিতে ভরপুর। সুতরাং অন্যায়কারীকে কোন সময়ই প্রশ্রয় দেয়া ঠিক নয়। কেননা, অন্যায়কারী ও অন্যায় সহ্যকারী উভয়েই বিধাতার নিকট অপরাধী।

 

 

অন্যায় যে করে অর অন্যায় যে সহে || ভাব-সম্প্রসারণ Read More

জাতীয় জীবনে সন্তোষ এবং আকাক্সক্ষা দুইয়ের মাত্রা বাড়িয়া গেলে বিনাশের কারণ ঘটে। ভাব-সম্প্রারণ

জাতীয় জীবনে সন্তোষ এবং আকাঙ্ক্ষা দুইয়ের মাত্রা বাড়িয়া গেলে বিনাশের কারণ ঘটে

আকাক্সক্ষা মানুষকে সামনে টেনে নেয়। আকক্সক্ষা না থাকলে প্রাপ্তির আনন্দের সুযোগ থাকে না। সন্তুষ্টি লাভের জন্য আকাক্সক্ষা থাকতে হয়। মূলত আকাক্সক্ষাই ব্যক্তিগত জাতীয় ও জীবনের উন্নতির মূল। আকাক্সক্ষা শেষ হয়ে গেলে জীবনের গতি থেমে যায়। আবার আকাক্সক্ষার মাত্রা যদি খুব বেশি হয়, তাহলে লক্ষে পৌঁছানো অসম্ভব হয়ে পড়ে।

জাতীয় জীবনে সšেতাষ এবং আকাক্সক্ষাÑএ দু’য়ের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। ব্যক্তিগত জীবনে মানুষ উচ্চাশা করে। কখনও আংশিক কখনও সম্পূর্ণ আবার কখনও একটুও পূরণ হয়না। তবুও মানুষ আশার আকাক্সক্ষা বুকে লালন করে। আশাই মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে। আশা না থাকলে জীবনের কোন অর্থ থাকে না। সেজন্য সহজে সন্তুষ্টি লাভ করা উন্নতির অন্তরায় বলে বিবেচিত হয়ে থাকে। যেমনÑ শিক্ষার্থীরা সবাই যদি এ+ প্রত্যাশা লালন করে, তাহলে নিদেনপক্ষে সে এ গ্রেড তো পাবে। কিন্তু কোন শিক্ষার্থীর মধ্যে যদি এ+ এর আকাক্সক্ষাই না থাকে তাহলে তার পক্ষে এ-(এ মাইনাস) পাওয়াও প্রায় সম্ভব নয়।

অনুরূপভাবে, জাতীয় জীবনেও উন্নতির জন্য আকাক্সক্ষা থাকা জরুরি। যে জাতি সুনির্দিষ্ট লক্ষ অর্জনের প্রত্যাশায় চেষ্টা চালাবে, সে জাতি উন্নতি অর্জন করবেই। উন্নত বিশ্বের উন্নতির মূলে লক্ষ করা যায় তাদের তীব্র আকাক্সক্ষা। চীন, মালয়েশিয়া, দুবাই এগিয়ে যাবার মূলে তাদের জাতীয় জীবনের আকাক্সক্ষা। অন্যদিকে অন্নুতদেশগুলির পিছিয়ে পড়ার মূলে তাদের প্রবল আকাক্সক্ষার অভাব।

তবে একথাও সত্যি, ব্যক্তিগত ও জাতীয় জীবনে আকাক্সক্ষা পরিতৃপ্তির মাত্রা থাকা জরুরি। বাস্তবতার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ না থাকলে আকাক্সক্ষা পূরণ হবার নয়। আবার অবাস্তব প্রত্যশা উভয় ক্ষেত্রেই হতাশা বাড়ায়। তাই ব্যক্তিগত ও জাতীয় জীবনে আকাক্সক্ষা পূরণ হবার সাথে যৌক্তিক বাস্তবতা থাকা প্রয়োজন।

আবার, যেখানে সন্তুষ্টি সেখানেই স্থবিরতা। অল্পতেই সন্তুষ্ট থাকা ভালো। কিন্তু সন্তুষ্টির মাত্রা থাকা প্রয়োজন। কারণ অতিমাত্রার সন্তুষ্টি ও পরিতৃপ্তিবোধ অলস ও নিস্ক্রিয় করে তোলে। সেক্ষেত্রে কাঙ্খিত সাফল্য অর্জন ব্যর্থ হয়। তাই, আমাদের মনে রাখতে হবে অবাস্তব কোন কিছুই সুফল বয়ে আনে না।

জাতীয় জীবনে সন্তোষ এবং আকাক্সক্ষা দুইয়ের মাত্রা বাড়িয়া গেলে বিনাশের কারণ ঘটে। ভাব-সম্প্রারণ Read More

প্রয়োজনে যে মরিতে প্রস্তুত, বাঁচিবার অধিকার তাহারই ।। ভাব-সম্প্রাসারণ

প্রয়োজনে যে মরিতে প্রস্তুত, বাঁচিবার অধিকার তাহারই

বেঁচে থাকতে চাইলে মরণকে তুচ্ছ বিবেচনা করতে হবে। ন্যায় ও সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য হাসিমুখে যারা জীবন উৎসর্গ করেন, তারাই কেবল অমরত্ব লাভের অধিকারী হয়। দেশ, জাতি ও ধর্মের জন্য যারা প্রাণ দেয়, পৃথিবীতে অমরত্ব কেবল তারাই প্রাপ্য হয়। বলিষ্ঠ প্রত্যয়ের মধ্যেই জীবনের সার্থকতা।

মানুষ যদি মর্যাদা সহকারে বাঁচার চেষ্টা না করে তাহলে জীবনের সার্থকতা ফুটে ওঠে না। সে বাঁচা মৃত্যুর সামিল। আর মর্যাদা সহকারে বাঁচতে হলে সমস্ত বিপদ-আপদ সাহসের সাথে মোকাবিলা করতে হবে। বিপদ ও মৃত্যুকে যে এড়িয়ে চলতে চায় সে কাপুরুষ। এ ধরনের মানুষের জীবনে পরিপূর্ণ বিকাশ ঘটে না। মৃত্যুর পরও অনেকে মানুষের কাছে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকে। জীবনে সাফল্য অর্জন করতে হলে মৃত্যু-ভয়কে জয় করতে হবে, মরণকে উপেক্ষা করে নিজেকে মহৎ কাজে আন্তনিয়োগ করতে হবে। সাহসের সাথে বেঁচে থাকাই হচ্ছে প্রকৃত বাঁচা। প্রবাদ আছে- শিয়ালের মতো হাজার দিন বেঁচে থাকার চেয়ে বাঘের মতো একদিন বেঁচে থাকাও অনেক ভাল। আর এভাবে মৃত্যু হলেও সে মৃত্যু হয় অহংকারের – এ মৃত্যুর মধ্যে দিয়েই মানুষ হয় চিরস্মরণীয়। সে হয় যথার্থ মানুষ। মৃত্যুকে সে বন্ধু বলে বুকে আঁকড়ে ধরতে চায়। ফ্রাঙ্কলিনের ভাষায়, “মানুষ না মরা পর্যন্ত পরিপূর্ণভাবে জন্ম লাভ করে না।” কারণ যাঁরা পৃথিবীতে অমরত্বের আসন অলকৃত করে আছেন, চির বাঁচা বেঁচে আছেন মানুষের মনে; তাঁরা সবাই মহান মৃত্যুকে বরণ করেছেন মহত্ত্বপূর্ণ কাজে।

একমাত্র বিরোচিত মৃত্যুই মানুষের এ আকাক্সক্ষাকে অমরত্ব দান করে। যেমন করে আমাদের মাঝে বেঁচে আছেন  ক্ষুদেরাম, নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু। এঁরা মৃত্যুভয়কে উপেক্ষা করে জীবনকে উৎসর্গ করে মানুষের মাঝে অমরত্ব হয়ে আছেন।

প্রয়োজনে যে মরিতে প্রস্তুত, বাঁচিবার অধিকার তাহারই ।। ভাব-সম্প্রাসারণ Read More

ফ্যাশনটা মুখোশ, স্টাইলটা হল মুখশ্রী । ভাব-সম্প্রসারণ

ফ্যাশনটা মুখোশ, স্টাইলটা হল মুখশ্রী

ভাব-সম্প্রসারণ: অপসংস্কৃতি অনুসরণ ও লালন করাই হলো মুখোশ। আর স্বকীয়তাই হলো স্টাইল; সৌন্দর্য; অর্থাৎ-মুখশ্রী। মানুষের নিজস্ব বৈশিষ্ট্যই প্রকৃত বৈশিষ্ট্য। প্রকৃত সত্তার সৌন্দর্যও সেখানেই। মানুষের স্বকীয়তা নিজস্ব দাবিতে ভাস্বর থাকবে-এটাই স্বভাবিক।

মানবজাতি খুব বেশি অনুকরণপ্রিয়। নিজেদের স্বকীয়তা ভুলে গিয়ে অন্যকে অনুকরণ করতে পছন্দ করে। রবীন্দ্র যুগে অনেক কবি-সাহিত্যিকগণও স্বকীয়তা ভুলে গিয়ে রবীন্দ্র বলয়ে ঢুকে পড়েন। আবার যুগের তালেই মানুষ নিজ সংস্কৃতি ভুলে আগ্রাসী সংস্কৃতি গ্রহণ করে। আমরা নিজেদের তথাকথিত আধুনিক হবার নামে তাদের অনেক কিছু অনুকরণ করি। কিন্তু এ অনুকরণের ফলে আমাদের কোনো নিজস্বতা থাকে না। বরং আমাদের মাঝে এগুলোর প্রভাবে গড়ে ওঠে একটা ঠুন্কো আধুনিকতা। যে আধুনিকতার অভাব থাকে নিজস্ব বৈশিষ্ট্যের।

নিজস্ব ঐতিহ্য-সংস্কৃতিতে অগ্রসর হলে তাতে কোনো মিথ্যে আবরণ থাকে না। থাকে না কোনো জড়তা। থাকে না অপসংস্কৃতির আগ্রাসনে সমাজ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার সম্ভাবনা। অন্যের যা কিছু ভাল, তা গ্রহণ করা খারাপ নয়। তবে অবশ্যই সেগুলো আমাদের সমাজ, সাহিত্য ও সংস্কৃতির সাথে মানানসই হতে হবে । নিজস্ব সংস্কৃতির পরিসরে বিচরণ করলে কোনো কু প্রভাব আমাদের উপর মুখোশের মতো চেপে বসতে পারে না। অন্যের সবকিছু নিয়ে যদি আমরা মুখোশ পরিধান করি, তাহলে আমরা আমাদের নিজস্বতাকে আড়াল করলাম। আমাদের স্বকীয়তাকে নিজ হাতে ধ¦ংস করলাম। নিজস্ব সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য আমাদের মুখশ্রীকে আরো উজ্জল করে তোলে ।

সর্বোপরি, আমরা না হতে পারছি বিদেশি না হতে পারছি স্বদেশি। একটি মিশ্র আবরণ আমাদের ঘিরে রেখেছে।

ফ্যাশনটা মুখোশ, স্টাইলটা হল মুখশ্রী । ভাব-সম্প্রসারণ Read More

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

বঙ্কিমচন্দ্র ২৬ জুন, ১৮৩৮ সালে পশ্চিম বঙ্গের চব্বিশ পরগনার কাঁঠালপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন । বঙ্কিমচন্দ্রের উপাধি ‘ সাহিত্য সম্রাট ‘ । এছাড়াও তাকে ‘ বাংলা উপন্যাসের জনক বলা হয় । তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বপ্রথম Graduate এবং পেশায় ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন । ‘ বঙ্গদর্শন নামে যে বিখ্যাত সাহিত্য পত্রিকার তিনি প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ছিলেন , বাংলা সাহিত্যের বিকাশে এবং শক্তিশালী লেখক সৃষ্টিতে তার অবদান অসামান্য । তিনি ৮ এপ্রিল , ১৮৯৪ সালে মৃত্যুবরণ করেন ।

বঙ্কিমচন্দ্রের সব উপন্যাসই রোমান্সমূলক’

বাংলা সাহিত্যের প্রথম সার্থক ঔপন্যাসিক বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (১৮৩৮-৯৪)। বাংলা সাহিত্যে তিনি রোমান্সমূলক উপন্যাসের স্রষ্টা । তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘দুর্গেশনন্দিনী’তে রোমান্সমূলক ধারার সূত্রপাত হয়েছে । চিন্তা-চেতনায় ইউরোপীয় আদর্শের অনুসারী বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর সাহিত্যে কল্পনা জগতের অবাধ বিচরণ ঘটিয়েছেন । তাঁর রচিত ‘কপালকুণ্ডলা’ বাংলা সাহিত্যের অসাধারণ রোমান্টিক উপন্যাস। এ রোমান্সের ধারা শেষ পর্যন্ত বিষবৃদ্ধ, কৃষ্ণকান্তের উইল, রজনী, মৃণালিনী, ইন্দিরা প্রভৃতি উপন্যাসেও অব্যাহত ছিল। এসব উপন্যাসে বাঙালির অতীত ইতিহাস যেমন স্থান পেয়েছে, তেমনি ব্যক্ত হয়েছে সমকালীন সমাজজীবনের কথা। উপন্যাসের আখ্যান বাস্তব জীবনকে ভিত্তিভূমি হিসেবে গ্রহণ করলেও বিস্ময়কর ও অলৌকিকের প্রতি তীব্র আকর্ষণ আছে । রোমান্স রচনায় ইতিহাস ও দৈবশক্তির সংমিশ্রণ ঘটিয়ে তার সাথে সংযুক্ত করেছেন রহস্যময় দৃঢ় ব্যক্তিত্বশালী মনুষ্যচরিত্র । ফলে তাঁর সব উপন্যাসেই নিগূঢ় ভাবসঙ্গতির রোমান্স ফুটে উঠেছে ।
বঙ্কিমচন্দ্রের ইতিহাস ও রোমান্সধর্মী উপন্যাস : দুর্গেশনন্দিনী, কপালকুঝলা, মৃণালিনী, চন্দ্রশেখর, রাজসিংহ, সীতারাম প্রভৃতি পরিমচন্দ্রের ইতিহাস ও রোমান্সধর্মী উপন্যাস |

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে বাংলা উপন্যাসের জনক বলা হয় কেন ?

উপন্যাসের প্রাথমিক প্রচেষ্টার বিচিত্র পরীক্ষা-নিরীক্ষার কালাতিক্রমের পর বাংলা সাহিত্যে প্রথম সার্থক উপন্যাস রচনার কৃতিত্ব বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের প্রাপ্য । বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর সাহিত্যিক জীবনে চৌদ্দটি উপন্যাস রচনা করেছেন । এসব উপন্যাসে বাঙালির অতীত ইতিহাস যেমন স্থান পেয়েছে , তেমনি ব্যক্ত হয়েছে সমকালীন সমাজজীবনের কথা । তাঁর উপন্যাসে বাস্তব জীবনকে ভিত্তিভূমি হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে এবং সেখানে অলৌকিকের প্রতি তীব্র আকর্ষণ বিদ্যমান রয়েছে । তাঁর উপন্যাসে রোমান্সের বৈশিষ্ট্য নিহিত আছে । রোমান্স রচনায় ইতিহাস , দৈবশক্তির সংমিশ্রণ ঘটিয়ে তার সাথে যুদ্ধ করেছেন রহস্যময় দৃঢ় ব্যক্তিত্বশালী মনুষ্যচরিত্র । (বঙ্কিম পূর্ববর্তী যুগে উপন্যাসের এত বহুমাত্রিক বিকাশ খুব বেশি লক্ষ করা যায় না । উপন্যাসের অবয়ব সমৃদ্ধ কিছু কিছু পুস্তক রচিত হয়েছে তবে উপন্যাসের সমস্ত লক্ষণ কেবল বঙ্কিমচন্দ্র রচিত উপন্যাসগুলোতেই প্রথম পাওয়া গেছে । এজন্যই তাঁকে বাংলা সাহিত্যের প্রথম সার্থক ঔপন্যাসিক বলা হয়ে থাকে ।

বঙ্কিমচন্দ্রের ব্যঙ্গরসাত্মক রচনাগুলো বাংলা সাহিত্যের গৌরবসর সংযোজন।

বভিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ( ১৮৩৮-১৮৯৪ ) বাংলা প্রবন্ধ সাহিত্যের ধারায় বিরাট প্রতিভা নিয়ে আবির্ভূত হন । তিনি বাংলা সমালোচনা সাহিত্যের অভূতপূর্ব সমৃদ্ধি সাধন করেন । তাঁর সমস্ত প্রবন্ধের বক্তবা পরিবেশনের গুণে সুস্পষ্ট ও মননদীও হয়ে উঠেছে । বঙ্কিমচন্দ্র তিন ধরনের প্রবন্ধগ্রন্থ রচনা করেছিলেন । যেমন-
১. ব্যঙ্গাত্মক ও সরস
২. জ্ঞান – বিজ্ঞান ও সমালোচনা বিষয়ক
৩. দর্শন ও শাচর্চাবিষয়ক ।
বঙ্কিমচন্দ্রের ব্যঙ্গরসাত্মক রচনাগুলো বাংলা সাহিত্যের গৌরবময় সংযোজন । এই প্রবন্ধগুলোতে বঙ্কিমচন্দ্র সমকালীন সমাজ , শিক্ষাদীক্ষা ও চারিত্রিক অসঙ্গতি কৌতুক রসের মধ্য দিয়ে চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন । এতে গুরুতর জত্ত্বকথাও সরল ও হৃদয়গ্রাহী হয়ে পড়েছে । ব্যাঘ্রাচার্য্য বৃহল্লাঙ্গুল, ইংরাজস্তোত্র, বাবু, গর্দভ, দাম্পত্য দণ্ডবিধির আইন প্রভৃতি ব্যঙ্গরসাত্মক রচনার উৎকৃষ্ট উদাহরণ । তবে ‘কমলাকান্তের দপ্তর’ (১৮৭৫) বঙ্কিমচন্দ্রের বিশিষ্ট ব্যঙ্গরসাত্মক রচনা। এ প্রবন্ধে তিনি আফিমখোর বৃদ্ধ ব্রাহ্মণের উক্তির মাধ্যমে পারিপার্শ্বিকতার ব্যঙ্গাত্মক চিত্র এঁকেছেন । তাঁর হাতে ব্যঙ্গবিদ্রূপ পেয়েছে এক ভিন্নমাত্রা।  বাংলা প্রবন্ধ সাহিত্যে তাঁর রচিত ব্যঙ্গরসাত্মক প্রবন্ধগুলো বিশিষ্ট স্থান অধিকার করেছে একথা নিঃসন্দেহে বলা যায় ।

বাংলা সাহিত্যের প্রথম সার্থক ঔপন্যাসিক হিসেবে বঙ্কিমচন্দ্রের কৃতিত্ব।

উপন্যাসের প্রাথমিক প্রচেষ্টার বিচিত্র পরীক্ষা-নিরীক্ষার কালাতিক্রমের পর বাংলা সাহিত্যে প্রথম সার্থক উপন্যাস রচনার কৃতিত্ব বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের প্রাপ্য। বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর সাহিত্যিক জীবনে চৌদ্দটি উপন্যাস রচনা করেছেন। এসব উপন্যাসে বাঙালির অতীত ইতিহাস যেমন স্থান পেয়েছে, তেমনি ব্যক্ত হয়েছে সমকালীন সমাজজীবনের কথা। তাঁর উপন্যাসে বাস্তব জীবনকে ভিত্তিভূমি হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে এবং সেখানে অলৌকিকের প্রতি তীব্র আকর্ষণ বিদ্যমান রয়েছে । তাঁর উপন্যাসে রোমান্সের বৈশিষ্ট্য নিহিত আছে । রোমান্স রচনায় ইতিহাস, দৈবশক্তির সংমিশ্রণ ঘটিয়ে তার সাথে যুদ্ধ করেছেন রহস্যময় দৃঢ় ব্যক্তিত্বশালী মনুষ্যচরিত্র । বঙ্কিম পূর্ববর্তী যুগে উপন্যাসের এত বহুমাত্রিক বিকাশ খুব বেশি লক্ষ করা যায় না । উপন্যাসের অবয়ব সমৃদ্ধ কিছু কিছু পুস্তক রচিত হয়েছে তবে উপন্যাসের সমস্ত লক্ষণ কেবল বঙ্কিমচন্দ্র রচিত উপন্যাসগুলোতেই প্রথম পাওয়া গেছে । এজন্যই তাঁকে বাংলা সাহিত্যের প্রথম সার্থক ঔপন্যাসিক বলা হয়ে থাকে ।

কপালকুগুলা চরিত্রের স্বরূপ নির্ণয়

কপালকুণ্ডলা বঙ্কিমচন্দ্র রচিত বাংলা সাহিত্যের প্রথম রোমান্টিক উপন্যাস । কপালকুণ্ডলা উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র। কপালকুগুলা অরণ্যে কাপালিকের কাছে প্রতিপালিত হয়েছে। সে সমাজের সংস্কার জানে না। নবকুমারের সঙ্গে তার প্রণয় ও পরিণয় এবং পরবর্তীতে সমাজ বন্ধনের সাথে জন্মই তার চরিত্রটিকে ফুটিয়ে তুলেছে । তার চরিত্র রহস্যময় । সে নবকুমারকে ভালবাসে , কাপালিক পরে তার শত্রু হয়ে যায়, কাপালিকের হাত থেকে নবকুমারকে বাঁচালেও মৃত্যুর মধ্য দিয়ে তার চরিত্রের রহস্যময়তাই পরিলক্ষিত হয় ।
কপালকুণ্ডলা’ উপন্যাসে দুটি ত্রিভুজ প্রেমের আভাস আছে-
১. মতিবিধি > নবকুমার > কপালকুগুলা
২. মতিবিধি > সেলিম > মেহেরুন্নেসা “
*কাপালিকের গৃহ হতে খাদ্যান্বেষণে বের হয়ে নরকুমার সমুদ্রপাড়ে গিয়ে বসলে কপালকুণ্ডলা নবকুমারকে ‘পথিক, তুমি পথ হারাইয়াছ ?  কথা বলেছিল ।

বাঙলা গদ্যে বঙ্কিমচন্দ্রের অবদান

১. বিদ্যাসাগরীয় ও আলালী রীতির সমন্বয় সাধন করে তাতে তিনি প্রাণ প্রতিষ্ঠা করেন এবং নিজের বৈশিষ্ট্যের ছাপ বসিয়ে দেন ।
২. বিচিত্র রচনাবলীর সাহায্যে বঙ্কিমচন্দ্র বাংলা ভাষাকে যথার্থ উৎকর্ষমণ্ডিত করেন ।
৩. গদ্য রচনার যে বিশেষ স্টাইল বা রীতি রয়েছে সেটা তিনিই প্রথম পরিপূর্ণভাবে তুলে ধরেন ।
৪. তাঁর সাহিত্য রচনায় ভাষা ভাবের বাহন থেকে রসের বাহনে উন্নতি হয়; বাঙালি পাঠক গদা সাহিত্য থেকে রসের তৃষ্ণা মেটাতে সক্ষম হয় ।
৫. প্রবন্ধ রচনায় তাঁর ভাষ্য মনীষার বাহন হয়ে ওঠে । ব্যঙ্গাত্মক ও সরল রচনা , জ্ঞান – বিজ্ঞান ও শাস্ত্র আলোচনা এবং মননশীল প্রবন্ধ ও বিশ্লেষণধর্মী আলোচনা সব বিষয়ের উপযোগী হয়ে ওঠে বাংলা গদ্য ।
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় Read More