ছফার পরিবার

মোহাম্মদ আব্দুর রউফ

এক
বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে কখনোসখনো আহমদ ছফার (১৯৪৩-২০০১) ছবি দেখে বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকতাম। এখনো থাকি। এই পূর্বাপর তাকানোর মধ্যে আসমান-জমিনের ন্যায় ফারাক। তখন জীবিত আহমদ ছফা আমার কাছে মোটেই গুরুত্ব পায়নি। এমনকি একটি বইও সংগ্রহ করিনি। মূলত একাডেমিক প্রয়োজন ছাড়া তখন কোনো বই-ই সংগ্রহ করতাম না। আমাদের ছাত্রজীবন সমাপ্ত হওয়ার পূর্বেই আহমদ ছফার জীবনের অবসান ঘটে যায়। প্রয়াণের দুদশক পেরিয়ে গেলেও এখনো আহমদ ছফার দিকে তাকিয়ে থাকি। সেই তাকানোতে বিস্ময়বোধ গভীর থেকে গভীরতর হচ্ছে। যেখানেই থাকি, আহমদ ছফার মেরুন রঙের রচনাবলি চোখের সামনে ভাসতে থাকে, ভাসতে থাকে ছফার সাদাকাল ঐ চিন্তাগ্রন্থ ছোট্ট ছবিটি। কী ভাবতেন আহমদ ছফা?
দুই
আহমদ ছফার জীবন ও সাহিত্যকর্মের দিকে তাকালে দেখা যায়, কেবল নিজেই ভাবতেন না তিনি, পরবর্তী প্রজন্মের জন্যও ভাবনার সুযোগ তৈরি করে দিয়েছেন। মাঝেমধ্যে আহমদ ছফাকে নিয়ে বিষম বিপদে পড়ে যাই। কখনোকখনো আহমদ ছফার কিছু কিছু মন্তব্য মেনে নিতে সত্যিই কষ্ট হয়। মনেপ্রাণে আহমদ ছফার পর্যবেক্ষণকে অসার প্রমাণ করতে উঠেপড়ে লাগি। যদি সত্যি সত্যি অসার প্রমাণিত হতো তাহলে দেশ ও জাতির জন্য নিঃসন্দেহে মঙ্গলজনক হতো। অন্তত দুএকটি পর্যক্ষেণ উল্লেখ করা দরকার। ‘নিহত নক্ষত্র’ গল্পে আহমদ ছফা লিখছেন-‘প্রবীণ সাহিত্যিকদের দেখলে আমার বর্ষীয়সী বারাঙ্গনার কথা মনে হয়।’ বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস (১৯৯৭) প্রবন্ধগ্রন্থে আহমদ ছফা লিখছেন-‘আমাদের কবি-সাহিত্যিকেরা আমাদের সমাজের সবচেয়ে নোংড়া মানুষ। তাঁরা দেশকে যে হারে ফাঁকি দিয়েছেন কোন কালোবাজারির সঙ্গে তার তুলনা হয় না। তাঁদের ছদ্ম আদর্শবাদিতার সঙ্গে গণিকাদের সতীপনার তুলনা করা যায়।’ আহমদ ছফার সমসাময়িক সময় ও সমাজ থেকে বর্তমান অবধি বুদ্ধিবৃত্তিক সমাজের দিকে একটুখানি নিবিড়ভাবে তাকালে দেখা যায়, আহমদ ছফার পর্যবেক্ষণে বিন্দু পরিমাণ সন্দেহ নেই। আহমদ ছফা সমকালে শীর্ষ সাহিত্যিক ছিলেন। নিজে সাহিত্যিক হওয়ায় সাহিত্য-সমাজের অন্তর্মহলের নোংরামি তিনি ধরতে পেরেছিলেন। মূলত সুবিধাবাদী সাহিত্যিকের সুবিধাবাদী স্বার্থপর আচরণ দেখে তিনি বিক্ষুদ্ধ হতেন। ছফার নানা লেখায় সেই বিক্ষুদ্ধ-মনের পরিচয় লক্ষ্য করা যায়।
তিন
আহমদ ছফা বাঙালি জাতিসত্তা জাগরণের প্রত্যক্ষ সাক্ষী। এই সাক্ষ্যের সাহিত্যিক বয়ান তার সাহিত্যকর্মের সর্বত্রই লক্ষ্য করা যায় বিশেষত অঙ্কুর (১৯৭৫) উপন্যাস এবং জাগ্রত বাংলাদেশ (১৯৭১) প্রবন্ধগ্রন্থে। আহমদ ছফা এই জাগরণ থেকেই স্বাধীন বাংলাদেশে কিছুটা হলেও পাশ্চাত্য রেনেসাঁ প্রত্যাশা করেছিলেন। সেই প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির মধ্যে বিপুল ব্যবধানে আহমদ ছফা ব্যথিত হয়েছিলেন। আহমদ ছফার অভিযোগ-শিক্ষক, শিল্পী-সাহিত্যিক, সাংবাদিক অর্থাৎ বুদ্ধিবৃত্তিক মহল তাঁদের দায়িত্ব পালন করেনি। আহমদ ছফার সুষ্পষ্ট বক্তব্য-‘বুদ্ধিজীবীরা যা বলতেন, শুনলে বাংলাদেশ স্বাধীন হত না। এখন যা বলছেন, শুনলে বাংলাদেশের সমাজ-কাঠামোর আমূল পরিবর্তন হবে না।’ আহমদ ছফা বাংলাদেশের সমাজ কাঠামো সাম্য, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা ইত্যাকার আদর্শে ঢেলে সাজাতে চেয়েছিলেন। এই সাজানোর জন্য দরকার ছিল ছোটখাট একটি বিপ্লবের। বিপ্লবের জন্য দরকার ছিল বিপ্লবী-নেতৃত্বের। আহমদ ছফা একজন মানুষ (নেতৃত্ব) প্রত্যাশা করেছিলেন, যে কাঁদাজল মাখা মানুষের সঙ্গে কাঁদাজল মেখে তাদের শক্তি ও সাহস দিয়ে এই জাতিকে জাগিয়ে তুলবে। কিন্তু তা হয়নি। হয়তোবা একারণেই আহমদ ছফা কিছুটা অভিমানে প্রবীণ বটের কাছে প্রার্থনা জানিয়েছিলেন।
চার
আহমদ ছফার ছোট্ট এই জীবনখানির দিকে একটু নিবিড়ভাবে তাকালে আমরা দেখব, নিজের স্বাস্থ্য ও সম্পদের দিকে তিনি একেবারেই নজর দেননি। বিয়েসাদি করেননি। স্ত্রী-পুত্র, পরিবার-পরিজন ছিল না। দেশের মানুষকেই তিনি পরিবার মনে করতেন। ব্যক্তিজীবনেও তিনি বিপদগ্রস্থ মানুষের পাশে সাধ্যমত দাঁড়াতেন। এমনকি জীবনের ঝুঁকি নিয়েও। আহমদ ছফার স্মারকগ্রন্থে নানাজন নানাভাবে আহমদ ছফার এই মানবিক মহানুভবতার কথা উল্লেখ করেছেন। তবে ব্যক্তিমানুষ আহমদ ছফার উদ্দেশ্য ছিল না। তিনি মূলত পুরো জাতির পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। বাঙালি জাতিকেই জাগিয়ে তুলতে চেয়েছিলেন। এজন্য সাহিত্যকে মাধ্যমরূপে ব্যবহার করেছিলেন। প্রমাণ স্বরূপ বাঙালি মুসলমানের মন (১৯৮১) প্রবন্ধগ্রন্থটি স্মরণ করা যেতে পারে। গ্রন্থটি সমকালে বিপুল আলোড়ন তুললেও অনেকেই সমালোচনার পথ বেছে নিয়েছিল। এমনকি আজও কোনো কোনো বটতলার পন্ডিতকে ঐ পথে হাঁটতে দেখা যায়। বাঙালি মুসলমানের মন (১৯৮১) প্রবন্ধগ্রন্থে আহমদ ছফা মূলত বাঙালি মুসলমানের মনস্তাত্ত্বিক সংকট ও সমস্যার কথা চিহ্নিত করেছেন। সেই সঙ্গে সংকট কাটিয়ে বাঙালি মুসলমানের মধ্যে বিজ্ঞানভিত্তিক জাগরণ প্রত্যাশা করেছেন।

পাঁচ
বাঙালি মুসলমানের জাগরণ প্রত্যাশা করলেও আহমদ ছফা অপরাপর কোনো জাতিগোষ্ঠীকে অবহেলা করেননি। বরং হিন্দু, বৌদ্ধ, মুসলিম, খ্রিষ্টান, জৈনসহ সমুদয় ধর্মমত পেরিয়ে সবাইকে তিনি মানুষ হিসেবে বিবেচনা করতেন। এমনকি কখনোকখনো পুরো পৃথিবীকেই একটি রাষ্ট্ররূপে বিবেচনা করতেন। সংখ্যালঘু-সংখ্যাগুরু সবার অধিকারকে তিনি সমভাবে বিচার-বিবেচনা করতেন। এটি কেবল সাহিত্যিক চেতনা নয়। বাস্তব জীবনেও আহমদ ছফা সেটি বাস্তবায়ন করে দেখিয়েছেন। সুশীল নামের (উপজাতি) ছেলেটিকে তিনি সন্তানের মতো করে মানুষ করেছিলেন। আহমদ ছফার এই সামগ্রিক মানবিক বোধ পুষ্পবৃক্ষ এবং বিহঙ্গ পুরাণ (১৯৯৬) উপন্যাসে গভীরভাবে লক্ষ্য করা যায়। কেবল সুশীল নয়, পৃথিবীর সমুদয় মানুষকে তিনি নিজের মধ্যে ধারণ করেছিলেন। ‘সকলে আমার মধ্যে আছে’-এই দার্শনিক ভাবনা কেবল উপন্যাসের পাতায় নয়, জীবন দিয়ে তিনি প্রমাণ করে গিয়েছেন।
ছয়
আহমদ ছফা দেশের মানুষ ও সমাজকে সুগভীরভাবে আপন করে নিয়েছিলেন। ভ্রাতুষ্পুত্র আনোয়ারকে ০১/১২/১৯৯১ খ্রিস্টাব্দে একটি চিঠিতে লিখতে দেখি-‘একটি জিনিষ তোমাদের ভুলে গেলে চলবে না, আমি যতটুকু আমার পরিবারের, তার চেয়েও বেশি সমাজের। আত্মীয়তার দাবিতে অধিক কিছু কামনা করা আমার কাছে উচিত হবে না।’ কেবল আত্মীয় কিংবা রক্তের সম্পর্ক নয়, মূলত পুরো বাঙালি জনগোষ্ঠীকেই তিনি নিজের পরিবার বিবেচনা করতেন। এই মহান মনীষী ৩০জুন পূর্বদেশে দেশে জন্মেছিলেন। জন্মদিনে এই মনীষীর প্রতি অশেষ শ্রদ্ধা।

লেখক: পিএইচ ডি গবেষক ।