ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর

২৬ সেপ্টেম্বর , ১৮২০ সালে মেদিনীপুর জেলার বীরসিংহ গ্রামে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর জন্মগ্রহণ করেন ।  পৈতৃক পদবি  বন্দ্যোপাধ্যায়  । শিল্পসম্মত বাংলা গদ্যরীতির জনক ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাচর্চা ও পাণ্ডিত্যের স্বীকৃতি হিসেবে ১৮৪০ সালে সংস্কৃত কলেজ থেকে বিদ্যাসাগর  উপাধি পান । তিনি ঈশ্বরচন্দ্র শর্মা নামে স্বাক্ষর করতেন । আজও সমগ্র বাঙালি সমাজে তিনি  বিদ্যাসাগর  উপাধিতেই সর্বজন পরিচিত । তিনি ২৯ জুলাই  ১৮৯১ সালে মৃত্যুবরণ করেন । বাংলা গদ্যসাহিত্য বিকাশে বিদ্যাসাগরের অবদান মূল্যায়ন করতে গিয়ে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন ‘ বিদ্যাসাগর বাংলা ভাষার যথার্থ শিল্পী ছিলেন ।

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকে কেন বাংলা গদ্যের জনক বলা হয় ?

বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের বিবর্তনের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর । পাণ্ডিত্যের গভীরতায়, মানসিকতার উদারতায়, সমাজ সংস্কারের তৎপরতায় তাঁর যে চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য প্রকাশ পেয়েছে, তা এদেশের সমাজ-সংস্কৃতির ইতিহাসে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে গ্রাহ্য । বাংলা গদ্যের অবয়ব নির্মাণে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বিশিষ্ট ভূমিকা পালন করেছিলেন । গদ্যের অনুশীলন পর্যায়ে বিদ্যাসাগর সুশৃঙ্খলা, পরিমিতিবোধ ও ধ্বনি প্রবাহে অবিচ্ছিন্নতা সঞ্চার করে বাংলা গদ্যরীতিকে উৎকর্যের এক উচ্চতর পরিসীমায় উন্নীত করেন । তাঁরই বলিষ্ঠ প্রতিভার জাদুস্পর্শে বাংলা পূর্ণ সাহিত্যিক রূপ অধিগ্রহণ করেছে । গদ্য অস্থির গতি অতিবাহিত করে স্থিরতার পর্যায়ে পৌঁছেছে । গদ্যচর্চার ব্যাপক অনুশীলনের মাধ্যমে গদ্যের সমস্ত জটিলতা দূরীভূত হয়েছে । গদ্যের সাবলীল রূপ দিয়ে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বাংলা সাহিত্যে অমর হয়ে আছেন । গদ্য সৃষ্টির প্রাথমিক পর্যায়ে শৃঙ্খলা, পরিমিতিবোধ ও যতি চিহ্নের মাধ্যমে বাংলা গদ্যের অবয়ব নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার জন্যে ঈশ্বরচন্দ্রকে ‘ বাংলা গদ্যের জনক ‘ বলা হয় ।

সাহিত্যকর্ম ও সমাজকর্ম এ দুইয়ের মধ্যে কোনটির জন্য বিদ্যাসাগর অধিক সুপরিচিত ?

বাংলা গদ্যের অবয়ব নির্মাণে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান যেমন অপরিসীম তেমনি সমাজ সংস্কারেও বিদ্যাসাগর অনস্বীকার্য । বিদ্যাসাগরের সাহিত্য সাধনার পশ্চাতে সমাজসেবকের মনোবৃত্তি কার্যকরী ছিল । তিনি ছিলেন নিয়মনিষ্ট, ইংরেজি শিক্ষার প্রতি তার পৃষ্ঠপোষকতা ছিল, তিনি বাল্যবিবাহের বিরোধিতা করেছেন, বিধবাবিবাহের জন্য সর্বস্ব পণ করেছিলেন এবং নিজের আদর্শকে চিরদিন সমুন্নত রেখেছেন । ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের সমাজ সম্পর্কিত প্রবন্ধ গ্রন্থগুলোর মধ্যে ‘বিধবাবিবাহ প্রচলিত হওয়া উচিত কি না এতদ্বিষয়ক প্রস্তাব’ এবং ‘বহু বিবাহ রহিত হওয়া উচিত কিনা এতদ্বিষয়ক বিচার’ উল্লেখযোগ্য । হিন্দু সমাজের আবহমানকালের অনুসৃত হৃদয়বিদারক অনাচারগুলো বিদ্যাসাগরের মনকে সহানুভূতিশীল করে তুলেছিল । তাঁর রচনাবলিতে সে নিদর্শন বিদ্যমান ।

সাহিত্য ও সমাজকর্ম – এ দুটি বিষয়েই বিদ্যাসাগরের রয়েছে সরব পদচারণা । সাহিত্যের খ্যাতি যেমন তাকে প্রসিদ্ধ করেছে তেমনি সমাজসংস্কারের অদম্য প্রচেষ্টা তাঁকে সমাজ সংস্কারক হিসেবে সুপরিচিত করেছে । তবে বিদ্যাসাগর মূলত সমাজ সংস্কারক হিসেবেই বাঙালি সমাজে অবিস্মরণীয় ।

বিদ্যাসাগর বাংলা ভাষার প্রথম যথার্থ শিল্পী

বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের বিবর্তনের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর (১৮২০-১১) । তিনি গদারীতির মধ্যে লালিত্য সঞ্জার ও নমনীয়তা প্রণয়নপূর্বক ভাষারীতি হিসেবে গদ্যের মধ্যে প্রাণচাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে গৌরবময় অগ্রগতি সাধন করেন । বাংলা ভাষার অন্তর্নিহিত ধ্বনিপ্রবাহ অনুধাবন করে বাক্যে স্বাভাবিক শব্দানুবৃত্তির রূপ প্রদানপূর্বক গদ্যরীতিতে পরিমিতিবোধ সৃষ্টি করেন । বিদ্যাসাগরের পার্বও অনেক লেখক ভাষার সুষম বিকাশ সাধনে সচেষ্ট ছিলেন কিন্তু বিদ্যাসাগরের প্রচেষ্টা ছিল অদম্য। বস্তুতপক্ষে বিদ্যাসাগরের সৃষ্ট গদ্যরীতির প্রভাবেই পরবর্তী পর্যায়ে বাংলা গদ্যে পরিণত রূপের সৃষ্টি হয়। এজন্যই তাঁকে বাংলা ভাষার প্রথম যথার্থ শিল্পী হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়।

বিদ্যাসাগরের মৌলিক রচনা

১. বিধবাবিবাহ প্রচলিত হওয়া উচিত কিনা এতদ্বিষয়ক প্রস্তাব (১৮৫৫ )
২. বহু বিবাহ রহিত হওয়া উচিত কিনা এতদ্বিষয়ক বিচার (১৮৫৫)
৩. অতি অল্প হইল (১৮৭৩)
৪. আবার অতি অল্প হইল ( ১৮৭৩)
৫. ব্রজবিলাস (১৮৮৫)
৬. প্রভাবতি সম্ভাষণ (১৮৯১)
৭. রচিত জীবনচরিত (১৮৯১) ।

* ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর রচিত ‘প্রভাবতী সম্ভাষণ’ একটি শোকগাঁথা । এটি একটি মৌলিক রচনা । যার বালিকা কন্যা প্রভাবতীর অকাল মৃত্যুর শোকে বিদ্যাসাগর এটি রচনা করেন ।

* বিধবা বিবাহ প্রচলিত হওয়া উচিত কি না এতদ্বিষয়ক প্রস্তাব গ্রন্থে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বিধবা বিবাহের পক্ষে যুক্তি প্রদর্শন করেন ।

বিদ্যাসাগরের অনুবাদ গ্রন্থ

১. বেতাল পঞ্চবিংশতি ( ১৮৪৭ )
২ . শকুন্তলা ( ১৮৫৪ )
৩. সীতার বনবাস ( ১৮৬০ )
৪. ভ্রান্তি বিলাস ( ১৮৬৯ )
* হিন্দি ভাষায় লালুজি রচিত ‘ বৈতাল পৈচিচসি ‘ অবলম্বনে বিদ্যাসাগর ‘ বেতাল পঞ্চবিংশতি ‘ রচনা করেন । এটি বাংলা ভাষার প্রথম কাহিনীধৰ্মী গ্রন্থ ।  প্রথম বিরাম বা যতি চিহ্নের প্রথম সফল প্রয়োগ করেন  এই গ্রন্থে ।

বাংলা গদ্য সাহিত্যে বিদ্যাসাগরের অবদান মূল্যায়ন 

যাঁর হাতের ছোঁয়ায় বাংলা গদ্য রূপময় হয়ে ওঠে, তিনি ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। গদ্যের অনুশীলনী পর্যায়ে বিদ্যাসাগর সুশৃঙ্খলা, পরিমিতিবোধ ও ধ্বনিপ্রবাহে অবিচ্ছিন্নতা সঞ্চার করে বাংলা গদ্যরীতিকে উৎকর্ষের এক উচ্চতর পরিসীমায় উন্নীত করেন । বাংলা সাহিত্যে বিদ্যাসাগরের অবদান নিম্নভাবে মূল্যায়ন করা যায়:
১. বাংলা গদ্যের পালিতা ও নমনীয়তা দান করে বিদ্যাসাগর বাংলা গদ্যের সাহিত্যিকরূপ নির্মাণ করেন।
২. বিদ্যাসাগর বাংলা গদ্যের পদবিন্যাস রীতি বিশুদ্ধভাবে নির্ধারণ ও প্রয়োগ করেন ।
৩.পূর্ববর্তী পদ্যে যতিস্থাপন ছিল বিরল, বিরাম চিহ্নের যথাযথ ব্যবহার নির্দেশ করে তিনিই প্রথম বাংলা পদ্যের নিজস্ব ছদরূপটি আবিষ্কার করেন ।
৪. গদ্যে প্রবাদ প্রবচন ব্যবহার করে তিনি ভাষাকে সমৃদ্ধ, সরল ও আকর্ষণীয় করে তোলেন।

বালিকা বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে বিদ্যাসাগরের অবদান

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর সাহিত্যিক হিসেবে যতটা পরিচিত, সমাজসংস্কারক হিসেবেও সমধিক পরিচিত । শিক্ষা বিস্তারে বিশেষত নারী শিক্ষা বিস্তারে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য । তিনি মেয়েদের শিক্ষার সুযোগ করে দিতে ৩৫ টি বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করেন। শিক্ষা বিস্তারে তাঁর এই আগ্রহ লক্ষ করে ছোট লাট ফ্রেডারিক হ্যালিডে তাকে দক্ষিণাঞ্চলের স্কুলসমূহের বিশেষ পরিদর্শক নিযুক্ত করেন । এসময় তিনি আরও ২০ টি মডেল স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন । তিনি কলকাতায় বেথুন কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন । কর্তৃপক্ষের সাথে মতবিরোধ হওয়ায় তিনি ১৮৫৮ সালে সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষের পদ থেকে অবসর গ্রহণ করেন ।

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের ছদ্মনাম

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ‘কস্যাচিৎ উপযুক্ত ভাইপোস্য’ ছদ্মনামে লিখেছেন চারটি গ্রন্থ রচনা করেন-
১. অতি অল্প হইল (১৮৭৩)
২. আবার অতি অল্প হইল (১৮৭৩)
৩. ব্রজবিলাস (১৮৮৫)
৪. রত্নপরীক্ষা (১৮৮৬)